তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার কত টাকা পাবে, জনগণের পকেট কাটা যাবে কত?

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। সরকারের যুক্তি— আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানও বাড়ছে। তাই দাম সমন্বয় করে ভর্তুকির চাপ কমানো প্রয়োজন। 

কিন্তু দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তের আরেকটি দিকও রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে শুধু বিপিসির বিক্রয়মূল্য বাড়ে না, জ্বালানির ওপর বিদ্যমান শুল্ক-কর কাঠামোর কারণে সরকারের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশই বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে।

তাই এখন বড় প্রশ্ন— তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার কত টাকা পাবে, আর এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনগণের পকেট থেকে অতিরিক্ত কত টাকা বেরিয়ে যাবে?

২০ টাকা বাড়লো, বছরে কত টাকা বেশি যাবে?

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটার।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসির লোকসান কমবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে সরকারের ভর্তুকির চাপ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে।

অর্থাৎ সরকারের হিসাবে, মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি আর্থিক সুফল বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

কিন্তু এই ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারের ব্যয় কমার হিসাব। জনগণের পকেট থেকে সরাসরি কত টাকা অতিরিক্ত বের হবে, তার পরিমাণ আরও বড় হতে পারে। কারণ জ্বালানি শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাসের জ্বালানি নয়; দেশের প্রায় প্রতিটি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে এটি যুক্ত।

ডিজেলের দাম বাড়লে বাড়বে পণ্য পরিবহনের খরচ 

দেশে পণ্য পরিবহনের বড় অংশই ডিজেলচালিত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও নৌযানের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়লে পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে।

যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া ইতোমধ্যে কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। পণ্যবাহী পরিবহনেও বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়বে। একটি পণ্য উৎপাদনের পর কারখানা থেকে পাইকারি বাজার, সেখান থেকে খুচরা বাজার—প্রতিটি পর্যায়ে পরিবহন লাগে।

ফলে ডিজেলের বাড়তি দাম শুধু পাম্পে গিয়ে গাড়িতে জ্বালানি নেওয়ার সময়ই অনুভূত হবে না। চাল, ডাল, সবজি, মাছ, মাংস, পোশাক কিংবা নির্মাণসামগ্রী— প্রায় সব পণ্যের দামেই এর প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থাৎ একজন মানুষ গাড়ি ব্যবহার না করলেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির খরচ তাকে বহন করতে হবে পণ্য কেনার সময়।

কৃষকের খরচও বাড়বে

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অন্যতম বড় প্রভাব পড়তে পারে কৃষিতে। সেচের পাম্প, জমি প্রস্তুত, ফসল পরিবহন— বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজেল ব্যবহৃত হয়।

ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। কৃষক সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করতে চাইবেন। এতে বাজারে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

একইভাবে শিল্পকারখানায় পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনের ব্যয় বাড়বে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসার পরিচালন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তেলের দাম বাড়লে সরকারের রাজস্বও বাড়ে

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনে বর্তমানে প্রায় ৩১ দশমিক ৮৫ শতাংশ শুল্ক-কর রয়েছে। এর মধ্যে আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ এবং অগ্রিম কর সাড়ে ৭ শতাংশ। এর বাইরে বিতরণ পর্যায়েও রয়েছে ২ দশমিক ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ইনভয়েস ভ্যালুর ওপর লিটারপ্রতি এক টাকা শুল্ক।

এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের আমদানি মূল্য বাড়লে শুল্ক-কর হিসাবের পরিমাণও বাড়তে পারে।

এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল থেকে সরকারের রাজস্ব ছিল প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা বা প্রায় ২৯ শতাংশ।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জ্বালানি তেল ও এলপিজি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ জ্বালানির দাম ও আমদানি মূল্য বাড়ার সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রবণতাও ঊর্ধ্বমুখী।

তাহলে জনগণের ওপর মোট চাপ কত?

এখানে সরাসরি একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক বলা কঠিন। কারণ একজন মানুষের বছরে কত লিটার জ্বালানি ব্যবহার করেন, একটি বাস কত কিলোমিটার চলে, একটি ট্রাক কত পণ্য পরিবহন করে কিংবা একটি কারখানা কত জ্বালানি ব্যবহার করে— তা একেক ক্ষেত্রে একেক রকম।

তবে হিসাবের বিষয়টি সহজভাবে দেখলে, কোনও যানবাহনে এক মাসে ২০০ লিটার ডিজেল ব্যবহার হলে শুধু জ্বালানির বাড়তি দাম বাবদ মাসে ৪ হাজার টাকা বেশি খরচ হবে। বছরে তা দাঁড়াবে ৪৮ হাজার টাকা।

কোনও পরিবহনকারী বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবহার যদি কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ লিটার হয়, সেখানে বাড়তি ব্যয়ের অঙ্কও কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত যেতে পারে।

এর সঙ্গে যোগ হবে পরিবহন ভাড়া, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাব। ফলে জনগণের পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ শুধু পাম্পে অতিরিক্ত ২০ টাকা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বিপিসির লোকসান কত, সরকার কতটা কমাবে?

বিপিসির হিসাবে, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে প্রায় ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে প্রায় ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

এই লোকসান সামাল দিতে বিপিসি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এফডিআর থেকে তুলে ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ভর্তুকি চেয়ে জ্বালানি বিভাগে চিঠিও দিয়েছে।

বিপিসি একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সরকার শুল্ক কমানোর পরিবর্তে দাম বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন— বিপিসির লোকসান কমাতে জনগণের কাছ থেকে বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে জ্বালানির ওপর উচ্চহারে শুল্ক-কর আদায় অব্যাহত রাখার প্রয়োজন কতটা?

এক দশকের মুনাফার হিসাবও সামনে

বিপিসির বর্তমান লোকসানের বিপরীতে সংস্থাটির আগের এক দশকের আর্থিক চিত্রও আলোচনায় আসছে।

২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে পরবর্তী এক দশকে বিপিসি প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা কর ও লভ্যাংশ হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে।

অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে বিপিসি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের উৎসও ছিল।

তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিতে বিপিসির লোকসান যে বেড়েছে, সেটিও বাস্তবতা। ফলে প্রশ্নটি শুধু বিপিসি লাভ করেছে কি না, তা নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় সরকার কীভাবে সেই চাপ ভাগ করে নেবে— সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

অন্য দেশ কর কমিয়ে ভোক্তাকে স্বস্তি দিয়েছে

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর অন্তত ৫৫টি দেশ জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে শুল্ক-কর হ্রাসসহ বিভিন্ন রাজস্ব পদক্ষেপ নিয়েছে।

ভারত আবগারি শুল্ক কমিয়েছে। পাকিস্তান মোটরসাইকেল আরোহী, কৃষি ও পরিবহন খাতের মতো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা দিয়েছে। ভিয়েতনাম কয়েক মাসের জন্য কিছু জ্বালানি কর স্থগিত ও শুল্ক কমিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াও কর ছাড় ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার সমন্বিত ব্যবস্থা নিয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ায় সরকার দীর্ঘ সময় বড় ধরনের ভর্তুকি দেওয়ার অবস্থায় নেই। কিন্তু তাই বলে পুরো মূল্যবৃদ্ধির চাপ ভোক্তার ওপর দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই— এমনও নয়। শুল্ক-কর সাময়িক কমানো, বিপিসির ব্যয় ব্যবস্থাপনা, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কিংবা উচ্চমূল্যের সময়ে কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার মতো বিকল্প নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত হিসাবটা জনগণের

তেলের দাম বাড়িয়ে সরকারের হিসাবে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ কমতে পারে। কিন্তু এই অর্থের বিপরীতে জনগণের ওপর সরাসরি জ্বালানি ব্যয়, বাড়তি পরিবহন খরচ, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি— সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে তৈরি হবে বহুগুণ বড় প্রভাব।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ  ড. জাহিদ হোসেনের ভাষায়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হলে তা সামাল দেওয়ার জন্য রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সুতরাং জ্বালানির দাম বাড়ানোর হিসাব শুধু বিপিসির লোকসান কত কমবে— এখানে শেষ হয় না। এর সঙ্গে হিসাব করতে হবে, সরকার কত টাকা বাঁচাবে বা পাবে এবং সেই অর্থ জোগাতে জনগণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে মোট কত টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে।

কারণ জ্বালানির দাম বাড়ার প্রতিটি টাকার প্রভাব শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে মানুষের পকেটেই।