জিডিপিতে হঠাৎ গতি, আসলেই কি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি?

২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি বেড়েছে। এ সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬০ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ০৫ শতাংশ। মূলত শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়ায় শেষ প্রান্তিকে সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে। 

তবে অর্থনীতির এই ঘুরে দাঁড়ানোকে এখনই বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখতে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, আগের অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে কম ছিল। ফলে তুলনামূলকভাবে দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এবার প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংক খাতের নানা সমস্যা এখনো অর্থনীতির জন্য বড় বাধা হয়ে আছে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সাময়িক হিসাবে এসব তথ্য উঠে এসেছে। 

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মূল্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। 

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং ২ দশমিক ২২ শতাংশ। চার প্রান্তিকের সাময়িক হিসাব বিবেচনায় নিয়ে স্থির মূল্যে পুরো অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

শিল্পে বড় উত্থান

শেষ প্রান্তিকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে শিল্প খাতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন সময়ে স্থির মূল্যে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ।

বিবিএসের হিসাবে, শিল্প খাতের অন্যতম প্রধান অংশ উৎপাদনশিল্পে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। গত ছয় প্রান্তিকের মধ্যে এটিই উৎপাদনশিল্পের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।

শিল্প খাতে উৎপাদন ও নির্মাণ কার্যক্রম বাড়ায় সামগ্রিক শিল্প প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে। নির্মাণ খাতও সংকোচন থেকে বেরিয়ে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে নির্মাণ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাত ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। 

তবে পুরো অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিক ছিল না। প্রথম তিন প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ, ১ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ।

সেবা খাতেও গতি বেড়েছে

দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা সেবা খাতেও শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির উন্নতি হয়েছে। এপ্রিল-জুন সময়ে সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

তবে পুরো অর্থবছরে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিতে ওঠানামা ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ, ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ শেষ প্রান্তিকে এসে সেবা খাতে কিছুটা গতি ফিরেছে। 

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সামগ্রিক পরিস্থিতিতেও কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চতুর্থ প্রান্তিকে পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই)-এর গড় ৫৬ দশমিক ৮ পয়েন্টে উঠেছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৫৪ দশমিক ৪ পয়েন্ট।

কৃষিতে উল্টো চিত্র

শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কৃষি খাতে হয়েছে বিপরীত চিত্র। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। 

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ১১ শতাংশ, ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। 

ফলে শেষ প্রান্তিকে শিল্প ও সেবা খাতের উন্নতি সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে টেনে তুললেও কৃষি খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির একটি বড় অংশে চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

প্রবৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক অর্থনীতিবিদরা

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, উৎপাদনশিল্পে এতটা প্রবৃদ্ধি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো কঠিন। তার মতে, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বলতার মধ্যেও উৎপাদনশিল্পে এত বড় প্রবৃদ্ধির কারণ আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আগের অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ০৫ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। সেই দুর্বল ভিত্তির তুলনায় এবার প্রবৃদ্ধির হার স্বাভাবিকভাবেই বেশি দেখাচ্ছে। তাই এটিকে অর্থনীতিতে ব্যাপক ও শক্তিশালী গতি ফিরে আসার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রাজ্জাকের মতে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে আস্থা কিছুটা বাড়তে পারে। এর প্রভাব উৎপাদন কার্যক্রমে পড়ে থাকলে সেটিও শেষ প্রান্তকের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উৎপাদনশিল্পের প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই, তা বুঝতে আরও বিস্তারিত ও উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির তথ্য প্রয়োজন।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত দুই অর্থবছরের গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় সর্বশেষ প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি কিছুটা উৎসাহজনক। তবে বাংলাদেশের প্রয়োজন এবং অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি এখনো অনেক কম।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসের সঙ্গে পার্থক্য

বিবিএসের ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হিসাব প্রকাশের এক দিন আগে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও একই হারে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। 

বিশ্বব্যাংক বলেছে, জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করছে। 

সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬০ শতাংশে ওঠা অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর হলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিল্প ও সেবা খাতের উন্নতির পাশাপাশি কৃষির দুর্বলতা, বেসরকারি ঋণের ধীরগতি, জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধান না হলে এই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া কঠিন হবে।