উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মানুষের কাজের দক্ষতা উন্নয়নে সাশ্রয়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা স্মল এআই (Small AI) ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শীর্ষ পর্যায়ের আলোচকেরা। তাদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল পেতে বিপুল ব্যয়ের প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলাই একমাত্র পথ নয়। বরং স্থানীয় ভাষা, সীমিত ইন্টারনেট সুবিধা ও ছোট ব্যবসার সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলনের অংশ হিসেবে সোমবার (১২ অক্টোবর) ‘স্মল এআই: মোর অ্যান্ড বেটার জবস’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। এতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ, সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম, আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাসহ বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
আলোচনার অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের অনলাইন প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক ও বিজনেস এডিটর গোলাম মওলা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্মল এআইয়ের মাধ্যমে কীভাবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, সে বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বিশেষজ্ঞ ভ্যালেন্তিনা কালদেরন-মেহিয়া বলেন, স্মল এআই ছোট প্রতিষ্ঠান ও স্বনিয়োজিত মানুষের ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞের এই জবাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার, ছোট ব্যবসার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় এআই ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
ছোট ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে স্মল এআই
বাংলা ট্রিবিউনের প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ বলেন, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী স্বনিয়োজিত অথবা ১০ জনের কম কর্মী রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। এসব ছোট ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের কাজে স্মল এআই যুক্ত করা গেলে তাদের ব্যবসা বাড়ানো এবং কাজের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা পাওয়া সম্ভব।
এআই ব্যবহার করে ছোট ব্যবসায়ীরা পণ্যের মজুত ব্যবস্থাপনা, ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিপণন ও দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা আরও সহজে করতে পারেন। সাধারণ মোবাইল ফোনেও ব্যবহার করা যায়, এমন প্রযুক্তি এই কাজে সহায়ক হতে পারে। এতে সীমিত জনবল ও পুঁজি নিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম খরচে কাজের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ পাবে।
তবে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই কর্মসংস্থান বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এআইয়ের সুবিধা কাজে লাগাতে ছোট ব্যবসার অর্থায়ন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
পাইলট প্রকল্প থেকে বৃহত্তর পরিসরে
বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় স্মল এআইয়ের পরীক্ষামূলক ব্যবহার থেকে বেরিয়ে কার্যকর উদ্যোগগুলো বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক দেশে এআই নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু হলেও সেগুলোর সুফল সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব প্রযুক্তি বাস্তব পরিস্থিতিতে কার্যকর ফল দেয়, সেগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং উপযুক্ত নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে সম্প্রসারণ করতে হবে। সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ দেওয়া, নতুন উদ্যোগের জন্য অর্থায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মতো পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় উঠে আসে, স্থানীয় উদ্যোক্তারা যেন শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হয়ে না থাকেন, সে জন্য নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এআই তৈরি ও উন্নয়নের সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় ভাষায় তথ্যভান্ডার তৈরি, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজার সৃষ্টি এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্ভাবনা
স্মল এআইয়ের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে কৃষি অন্যতম। কৃষকেরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফসলের রোগ শনাক্ত করা, আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ, বীজ বপনের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ এবং বাজারদরের পূর্বাভাস পাওয়ার মতো কাজে এআই ব্যবহার করতে পারেন।
বিশ্বব্যাংকের অনলাইন প্রশ্নোত্তর পর্বে তানজানিয়ার একজন অংশগ্রহণকারী জানতে চান, কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র কৃষক এবং পশুপালকেরা কীভাবে সাশ্রয়ী এআইয়ের সুবিধা পাবেন। জবাবে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ সমীক্ষা খারে বলেন, স্থানীয় ভাষায় কণ্ঠস্বর বা লিখিত বার্তার মাধ্যমে এআইভিত্তিক পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। সাধারণ মোবাইল ফোনে কিংবা ইন্টারনেট ছাড়াই ব্যবহার করা যায়, এমন সমাধান কৃষক ও পশুপালকদের কাজে আসতে পারে।
তবে এসব প্রযুক্তির সুফল নিশ্চিত করতে ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণকর্মী ও স্থানীয় প্রশিক্ষকদের সহায়তায় কৃষকেরা প্রযুক্তির পরামর্শ বুঝতে এবং তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারবেন।
বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় আরও বলা হয়, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা থাকলেও কিছু স্মল এআই প্রযুক্তি সাধারণ যন্ত্রে এবং অফলাইনে চালানো সম্ভব। প্রত্যন্ত এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে কম্পিউটিং সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। তবে এসব সমাধানের কার্যকারিতা নির্ভর করবে স্থানীয় প্রয়োজন, প্রযুক্তির সক্ষমতা ও বাস্তবায়নের ওপর।
অর্থায়ন ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন
স্মল এআইয়ের সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে অর্থায়ন ও দক্ষতার ঘাটতি দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অনলাইন আলোচনায় বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীরা জানতে চান, স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ছোট পরিসরের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে।
জবাবে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞরা সরকারি ক্রয়, প্রাথমিক ও সম্প্রসারণ পর্যায়ের অর্থায়ন, অনুদান এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মতো উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত হালনাগাদ এবং দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তাঁরা।
শুধু এআই ব্যবহারের সংখ্যা দিয়ে এর সাফল্য বিচার না করে কর্মসংস্থান, আয় এবং কাজের মানের ওপর এর প্রভাব পরিমাপ করার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। কারণ উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের কাজের ধরন বদলে যেতে পারে কিংবা কিছু কাজের চাহিদা কমতে পারে। তাই নতুন কাজের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন। তাঁদের জন্য স্থানীয় ভাষায় সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং কম খরচের এআই প্রযুক্তি তৈরি করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট, সাশ্রয়ী ডিজিটাল যন্ত্র, স্থানীয় ভাষায় মানসম্মত তথ্য এবং এআই ব্যবহারের প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, প্রযুক্তির নির্ভুলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংককের সম্মেলনের আলোচনায় মূল বার্তা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো নয়; বরং মানুষের আয়, দক্ষতা ও কাজের সুযোগ উন্নত করা। স্মল এআইকে স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করে কার্যকরভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে প্রয়োজন উপযুক্ত নীতি, অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ওপর প্রযুক্তির প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়ন।