রিজার্ভ বাড়ছে, তবু বিপদ কাটছে না: বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফের সতর্কবার্তা

বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে আপাত স্থিতিশীলতা থাকলেও বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে দরপতন, সরকারি বন্ডের সুদ বেড়ে যাওয়া এবং সাইবার হামলার মতো ঝুঁকি আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। উচ্চ ঋণ, দুর্বল ব্যাংক ও সীমিত নীতিগত সক্ষমতা এসব ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। 

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬-এর ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট’-এ বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকির পাশাপাশি দুর্বলতা কাটাতে দ্রুত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নাম ধরে কোনও মূল্যায়ন করা হয়নি। তবে দেশের ব্যাংক খাতের সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ও দুর্বল প্রবৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিবেদনের বেশ কিছু সতর্কবার্তার মিল রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন দুই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কাটেনি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম।

ব্যাংক খাতে বাড়ছে উদ্বেগ

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ব্যাংকব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে চাপ সামলাতে পারলেও দুর্বল ব্যাংকের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। সংস্থাটির স্ট্রেস টেস্টে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের হিস্যা বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো লোকসান স্বীকার না করে ঋণ নবায়নের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের টিকিয়ে রাখতে পারে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি।

মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ অনুযায়ী, জুনে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। সংস্থাটির হিসাবে, শিথিল ঋণ শ্রেণিকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের নিয়মের কারণে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সঞ্চিতি রাখতে হয়নি।

এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা সম্প্রসারণে অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী, ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মান নির্ধারণ, ঋণ শ্রেণিকরণে স্বচ্ছতা এবং সম্ভাব্য লোকসানের বিপরীতে পর্যাপ্ত সঞ্চিতি রাখা জরুরি। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এসব সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট।

রিজার্ভে স্বস্তি, তবে চাপ পুরোপুরি কাটেনি

বৈদেশিক খাতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার।

৮ অক্টোবর মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ছিল ৩১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে চলতি বছরের জুন শেষে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ কিছুটা কমেছে।

প্রবাসী আয় রিজার্ভের অন্যতম প্রধান ভরসা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রবাসীরা দেশে ৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। তবে সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। ওই মাসে দেশে এসেছে ২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভ বাড়া বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সামলাতে সহায়তা করছে। তবে আমদানি ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতার ওপর এ স্বস্তি অনেকটাই নির্ভরশীল। আইএমএফও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও বড় সমস্যা

জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ চাপ সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।

মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২৪ শতাংশে উঠেছিল। পরে কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও চাপে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব আগামী দিনগুলোতেও মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে। ফলে আগামী এক-দুই মাসে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা সীমিত।

আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাও চাপে পড়ছে। এ অবস্থায় শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো নয়, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখাও নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রবৃদ্ধিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা প্রবৃদ্ধি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। অথচ সরকারের লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।

সংস্থাটির মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। অন্যদিকে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতা তুলে ধরে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের পরিচালক জাঁ পেসমে বলেছেন, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফেরা কঠিন।

কম প্রবৃদ্ধির অর্থ শুধু জাতীয় আয় কম বাড়া নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে নতুন কর্মসংস্থান, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির ওপরও।

ডিজিটাল লেনদেনে সাইবার ঝুঁকি

ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বও বাড়ছে। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে প্রকাশিত সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতাগুলোর ৭০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সংশোধনী ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই হামলা শুরু হয়েছিল।

সীমিত সম্পদের দেশগুলোকে মৌলিক সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হামলার ঘটনা দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিবেদন করা এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অবকাঠামো সুরক্ষার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক সেবা খাতের জন্যও এ সতর্কতা প্রাসঙ্গিক।

স্বস্তির সময়েই সংস্কার জরুরি

আইএমএফের প্রতিবেদন বাংলাদেশের জন্য সরাসরি মূল্যায়ন নয়। তবে এর সতর্কবার্তার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মিল উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রিজার্ভ ও প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি দিলেও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি আমদানির চাপ এবং কম প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করা, আর্থিক অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনা জরুরি। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা ও আর্থিক খাতের তদারকি জোরদার করতে হবে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখনো বড় সংকটে রূপ নেয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ধাক্কা এলে দুর্বল ব্যাংক, সীমিত রাজস্ব এবং উচ্চ জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের সংকটকে আরও গভীর করতে পারে। তাই রিজার্ভের সাময়িক স্বস্তিকে সাফল্যের শেষ ধাপ না ভেবে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা কাটানোর সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।