দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক তরুণের এই জনমিতিক সুবিধা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চাপে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি এ অবস্থান তুলে ধরে। আইএমএফের বৈশ্বিক নীতিগত কর্মসূচি নিয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
আইএমএফ জানায়, উন্নত অর্থনীতি ও কয়েকটি উদীয়মান দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। বিপরীতে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ হওয়ায় এসব অঞ্চলের সামনে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও যথাযথ বিনিয়োগ।
বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ তরুণ
দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ অঞ্চলে ৩৪ কোটির বেশি কিশোর-কিশোরী এবং ২৪ বছরের কম বয়সী ৭০ কোটির বেশি মানুষ রয়েছে।
বাংলাদেশেও তরুণ জনগোষ্ঠীর আকার উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে।
এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি না হলে জনসংখ্যার এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগের তাগিদ
আইএমএফ বলেছে, তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশগুলোকে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
শুধু নির্দিষ্ট কিছু চাকরি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে কর্মীদের নতুন কাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি। এ জন্য শ্রমবাজারকে আধুনিক করা, শ্রমশক্তিতে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কাজের প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বাধা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফের মতে, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সময় কর্মীদের সহায়তা দিতে হবে, যাতে তারা নতুন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারেন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন।
কর্মসংস্থানে বেসরকারি খাতের ভূমিকা
টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রাণবন্ত বেসরকারি খাতকে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে আইএমএফ। এ খাতের বিকাশে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, সুশাসন শক্তিশালী করা এবং অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
পাশাপাশি কার্যকর করব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো তরুণ জনগোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতিতে নতুন শিল্প ও ব্যবসার বিকাশ, উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। তাই তরুণদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতে নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকি
দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল অর্থায়নের বিস্তার নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে এসব প্রযুক্তি শ্রমবাজারে পরিবর্তন আনতে পারে এবং আয়বৈষম্য বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।
প্রযুক্তির সুফল পেতে ডিজিটাল অবকাঠামো, টেকসই জ্বালানি এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি এমন নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুফল সমাজের বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজে লাগে।
অর্থাৎ শুধু প্রযুক্তি গ্রহণ করলেই হবে না; এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া সুযোগ যেন নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান বা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষায় অগ্রাধিকার
আইএমএফ সরকারগুলোকে সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের আহ্বান জানিয়েছে। প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক খাতে ব্যয় সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির শক্তিতে রূপান্তর করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমবাজারকে প্রস্তুত করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য তাই বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী নয়, বরং তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, উপযুক্ত দক্ষতা ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। এই ক্ষেত্রগুলোতে কার্যকর বিনিয়োগ করা গেলে তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।