অর্থনীতির ওপর বাড়তে থাকা চাপ সামাল দিতে আগামী পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে মোট সাড়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অতিরিক্ত অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার বাইরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অবস্থানরত বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এ অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করছে। তবে প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ, ঋণের শর্ত এবং অর্থ ছাড়ের সময়সীমা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আলোচনা শেষে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে আশা করছে সরকার।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও বাড়তি অর্থনৈতিক সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক (চায়না এক্সিম ব্যাংক) বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ দেখিয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ব্যাংককে বিভিন্ন বৈঠক ও কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান।
বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার
আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত অর্থায়নের বাইরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার চায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলায় এই অর্থায়ন চাওয়া হয়েছে।
গত ১৩ অক্টোবর ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা বিজার্দের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সরকারের লক্ষ্য, বাড়তি অর্থায়নের মাধ্যমে জ্বালানি ও সারে ভর্তুকির ব্যয় সামাল দেওয়া, উন্নয়ন কার্যক্রম সচল রাখা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং অর্থ ছাড়ের গতি বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
তবে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থ ঋণ হিসেবে আসবে, নাকি এর মধ্যে অন্য কোনো ধরনের অর্থায়ন থাকবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত চূড়ান্ত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা শেষ হওয়ার পর অর্থায়নের ধরন ও শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
আইএমএফের কাছে নতুন করে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে আইএমএফের সঙ্গে নতুন করে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা।
নতুন কর্মসূচির আওতায় অর্থায়নের পরিমাণ, মেয়াদ ও শর্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভাব্য আলোচনায় রাজস্ব আয় বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চললেও অর্থ ছাড়ের বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঋণের শর্ত দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা এবং অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি না করে অর্থায়ন নিশ্চিত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের অনিয়ম এবং বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সামাল দিতে এই অর্থায়ন কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার ওপর এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও বাড়তি সহায়তা চায় সরকার
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। বুধবার ব্যাংককে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ঋণ ব্যবস্থাপনা, মার্কিন সহায়তা এবং দুই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অগ্রগতি এবং দেশটি থেকে আমদানি বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আরও সহায়তা পাওয়া উচিত।
তিনি বলেন, “বিগত দিনে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেকগুলো এয়ারক্রাফট কিনছি, তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য ও কমোডিটি আমদানি করছি। তাই তাদের কাছ থেকে আমাদের জন্য বাড়তি সহায়তা আসা উচিত। তারা এ বিষয়ে একমত হয়েছে। এখন দেখা যাক।”
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কী পরিমাণ অর্থায়ন বা কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও অঙ্ক জানাননি অর্থমন্ত্রী।
আইএমএফের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকায় দেশটির সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাড়তি সহায়তার বিষয়ে আলোচনা হলেও তা এখনও নির্দিষ্ট অর্থায়ন বা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতিতে রূপ নেয়নি।
চীনের বিনিয়োগে আগ্রহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আগামী সপ্তাহে ঢাকা সফর করবেন বলেও বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে।
চেয়ারম্যানের সফরকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিনিয়োগ নিয়ে আরও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারের অর্থনৈতিক নীতির মূল লক্ষ্য শুধু ঋণ নেওয়া নয়; বরং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানো। এর মাধ্যমে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করতে চায় সরকার।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমাদের অর্থনৈতিক নীতির মূল জোর হচ্ছে বিনিয়োগ। আমরা ঋণ থেকে সরে এসে সরাসরি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগের দিকে বেশি যেতে চাই।”
সরকারের এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঋণ তাৎক্ষণিক অর্থের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করলেও তা পরিশোধের জন্য ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে উৎপাদনশীল খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ স্বীকার করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে বর্তমান সরকার কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
তার ভাষ্য, অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের প্রচেষ্টার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো স্বীকার করেছে। এ কারণে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগসহ বিভিন্ন পক্ষ বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।
আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এ সহযোগিতার বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে সরকার আশা করছে। তবে আশ্বাসের কতটা বাস্তব অর্থায়নে রূপ নেবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
ঋণ চাওয়ার পাশাপাশি বাড়াতে হবে আয়
বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের কাছে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার চাওয়ার মধ্য দিয়ে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের বড় অঙ্কের বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন স্পষ্ট হয়েছে। দুই সংস্থার কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি সহযোগিতা এবং চীনের বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
তবে এই অর্থায়ন নিশ্চিত করাই শেষ কথা নয়। ঋণের শর্ত, সুদ ও পরিশোধের সময়সীমা দেশের জন্য কতটা সহনীয় হবে, অর্থ কত দ্রুত পাওয়া যাবে এবং তা কোন খাতে ব্যয় করা হবে— এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং রফতানি বহুমুখীকরণ জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস তৈরি করতে হবে।
সব মিলিয়ে, আগামী পাঁচ বছরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে সাড়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। এখন দেখার বিষয়, ব্যাংককে চলমান আলোচনা কতটা দ্রুত চূড়ান্ত হয় এবং প্রত্যাশিত অর্থায়ন দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।