প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে রফতানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য দেশের তৈরি সুতা বিক্রির সুরক্ষা নীতি চান বস্ত্রকল মালিকরা। শিল্প বাঁচাতে আমদানি করা অবৈধ সুতা-কাপড় বিক্রি বন্ধ, ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্রের মাধ্যমে দেশীয় বস্ত্রকল থেকে কটন সুতা সংগ্রহের বিধান ও রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) সুবিধা অব্যাহত রাখাসহ বেশ কিছু দাবি জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
মঙ্গলবার (৩০ মে) রাজধানীর পান্থপথে ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)’ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সহসভাপতি ফজলুল হক, পরিচালক সৈয়দ নূরুল ইসলাম, আবদুল্লাহ জুবায়ের, খোরশেদ আলম প্রমুখ।
মোহাম্মদ আলী বলেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সুতা ও কাপড়ের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। শুল্কমুক্ত সুবিধায় বন্ডেডওয়্যার হাউসের আওতায় আমদানি করা সুতা, কাপড় ও পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। ফলে সুতার মজুত বেড়ে যাওয়ায় বস্ত্রকলগুলোর আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে কয়েকটি মিল বন্ধ হয়ে গেছে। আরও মিল বন্ধ হওয়ার পথে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামী ঈদুল আজহার সময় মিলগুলো শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন, মজুরি বোনাসসহ পরিশোধ এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে তীব্র ডলার সংকট সত্ত্বেও গত ঈদুল ফিতরসহ সব সময় বন্ডেডওয়্যার হাউসের মাধ্যমে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী কর্তৃক আমদানি করা বিদেশি সুতা ও কাপড়, বিশেষ করে পাকিস্তানি ড্রেস-ম্যাটেরিয়েলের দেশের বড় বড় শহরের শপিং মলগুলোয় অবাধে বিক্রির কারণে স্থানীয় মিলগুলোর অবস্থা আজ সংকটাপন্ন।
শুধু পাকিস্তান থেকেই নয়, এর পাশাপাশি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীন থেকে আসা সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন ড্রেস-ম্যাটেরিয়েলও বিভিন্ন নগরী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন মোকামে তথা ঢাকার ইসলামপুরের বিক্রমপুর প্লাজায় (কোতোয়ালি থানার পাশে) নারায়ণগঞ্জ, আড়াইহাজার, গাউসিয়া, মাধবদী, বাবুরহাট, নরসিংদী ও সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ব্যাপকভাবে বিক্রয় হয়েছে এবং হচ্ছে, জানান তিনি।
স্পিনিং মিলগুলির সুতার উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে ক্ষেত্র বিশেষে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে জানিয়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, একই সঙ্গে মিলগুলো তাদের উৎপাদনক্ষমতা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে উৎপাদনক্ষমতার সম্পূর্ণ ক্যাপাসিটি ব্যবহার করতে না পারায় সুতার উৎপাদন খরচ আরেক দফা বেড়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে সুতার মূল্য পর্যায়ক্রমে হ্রাস পেয়ে এপ্রিল ২০২৩ সালে সুতার মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩০ কাউন্ট প্রতি কেজি ৩ দশমিক ১০ মার্কিন ডলার।
মিলগুলো শুধু তাদের উৎপাদন অব্যাহত, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতাদি পরিশোধসহ ইউটিলিটি বিল নিয়মিত পরিশোধের জন্য উৎপাদন খরচ অপেক্ষা ১৮ থেকে ২০ শতাংশ কম মূল্যে সুতা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে স্পিনিং মিলগুলোর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ গত ১৫ মাসে (জানুয়ারি ২০২২ থেকে মার্চ ২০২৩) প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
খাতটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সংবাদ সম্মেলনে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি করেছে বিটিএমএ।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বন্ডেড সুবিধায় আমদানি করা সুতা, কাপড় ও পোশাকের অবৈধ বিক্রি বন্ধে বাবুরহাট, নরসিংদী, ইসলামপুরসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে ঘন ঘন তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা, রফতানিমুখী স্পিনিং মিলে তৈরি সুতার ন্যূনতম একটি অংশ ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে সংগ্রহের বিধান করা, রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) সুবিধা অব্যাহত রাখা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত এবং ব্যাংকঋণের কিস্তি ও সুদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্লক হিসাবে রাখার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে সহজ কিস্তিতে পরিশোধের সুবিধা।