দেশের বৃহত্তম ও প্রথম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ৪২ বছরেরও বেশি সময় ধরে যেভাবে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে, তার পেছনে রয়েছে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব, শরিয়াহ-সম্মত নৈতিক ব্যাংকিং কাঠামো এবং যুগোপযোগী সেবা। সম্প্রতি ব্যাংকটির নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন দেশের ব্যাংকিং অঙ্গনের এক অভিজ্ঞ ও ব্যাংকার মো. ওমর ফারুক খাঁন। ইসলামী ব্যাংকে দীর্ঘদিন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা এই পেশাদার ব্যাংকার বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন ইসলামী ব্যাংকের চলমান কর্মকাণ্ড, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জগুলো।
সাক্ষাৎকারে তিনি আলোচনা করেছেন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের শক্তি, শুদ্ধাচারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, অনিয়ম থেকে উত্তরণের উদ্যোগ, স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, প্রবাসী সেবার সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাস্তব কার্যক্রম নিয়ে।
বাংলা ট্রিবিউন: ইসলামী ব্যাংক দেশের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। এত দীর্ঘ পথচলায় সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখায় আপনাদের মূলমন্ত্র কী?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: ইসলামী ব্যাংক শুরু থেকেই শরিয়াহ নীতি ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে। ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ যাত্রা শুরুর পরপরই এই ব্যাংক দেশের মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া তোলে। সুদভিত্তিক প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে বিকল্প খুঁজছিলেন যারা, ইসলামী ব্যাংক তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও নৈতিক সমাধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
মানুষ এমনকি পত্রিকায় খোলা চিঠি দিয়ে নিজ এলাকায় শাখা চেয়েছেন—এটাই ছিল ইসলামী ব্যাংকের প্রতি আস্থার প্রমাণ। সুদমুক্ত, শরিয়াহভিত্তিক ও নৈতিক ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকটি মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে আস্থা ও বিশ্বাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
বর্তমানে ব্যাংকটি দেশের বেশিরভাগ ব্যাংকিং সূচকে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে এবং শরিয়াহ নীতির প্রতি কঠোর নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা, আন্তরিক সেবা ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ধরে রেখেছে।
বাংলা ট্রিবিউন: সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে নানা বিতর্ক সত্ত্বেও ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যা ও আমানত বেড়েছে। এর কারণ কী?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: অব্যবস্থাপনা, লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে কিছু ব্যাংক গ্রাহক আস্থা হারিয়েছে। অথচ ইসলামী ব্যাংক দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। গত এক বছরে প্রায় ২৫ লাখ নতুন হিসাব খোলা হয়েছে এবং নতুন আমানত এসেছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা।
আমাদের মোট আমানত এখন প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এই আস্থার ভিত্তি হলো ইসলামী ব্যাংকের আদর্শিক অবস্থান, নৈতিক ব্যাংকিং এবং কঠোরভাবে শরিয়াহ অনুসরণ।
২০১৭ সালে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে অস্থিরতা তৈরি হলেও আমরা পুনর্গঠনের মাধ্যমে আবারও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: অনেকেই বলছেন, ইসলামী ব্যাংকের টিকে থাকার মূল শক্তি এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও নীতিমালা। আপনি কি একমত?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: নিঃসন্দেহে একমত। ব্যাংকটির ভেতরে যে অভ্যন্তরীণ সুশাসন, শক্তিশালী নীতিমালা ও শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং কাঠামো রয়েছে, তা ব্যাংকটির স্থায়িত্বের মূলে রয়েছে।
সুদমুক্ত ও অংশীদারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা নৈতিকতা ও জবাবদিহির একটি স্থায়ী ধারা প্রতিষ্ঠা করেছি। প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক কৌশল গ্রহণ করে আমরা সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছি।
বাংলা ট্রিবিউন: আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ইসলামী ব্যাংক কী কী সংস্কার নিয়েছে?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: আমরা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছি। অনিয়ম চিহ্নিত করে প্রতিরোধে টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করেছি। শাখাগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন হচ্ছে।
বিনিয়োগ বিতরণে কড়াকড়ি আরোপ করেছি এবং শরিয়াহ কাউন্সিল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণের সহজ মাধ্যম তৈরি করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ ইসলামী ব্যাংককে আগের চেয়ে আরও বেশি জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ করে তুলেছে।
বাংলা ট্রিবিউন: ইসলামী ব্যাংক কি এখন গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: হ্যাঁ, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে কোনও গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
এটি একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, যার পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী কাঠামোর মাধ্যমে পেশাদারত্ব ও স্বচ্ছতায় কাজ করছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে সমন্বিত এবং শরিয়াহ-অনুগত নীতিমালা।
বাংলা ট্রিবিউন: বিতর্কিত ঋণ বিতরণ ইস্যুতে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: যেসব বিতর্কিত ঋণের অভিযোগ উঠেছে— সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অনিয়মে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য বিনিয়োগ অনুমোদনে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে। আদায়ের জন্য পৃথক টিম কাজ করছে এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
বাংলা ট্রিবিউন: আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে কিছু বলবেন?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: আমরা সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই— ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা নিরাপদ। আমাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং শরিয়াহ-সম্মত কার্যক্রম আমানতের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করছে।
আমরা প্রতিটি আমানতকারীকে সম্মান করি এবং তাদের অর্থের সুরক্ষা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
বাংলা ট্রিবিউন: শাখা ও গ্রাহকসেবা আরও যুগোপযোগী করতে ইসলামী ব্যাংকের পরকিল্পনা কী?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: আমরা ডিজিটাল রূপান্তরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। সেলফিন অ্যাপ, অনলাইন ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন ফিনটেক সেবা উন্নত করা হচ্ছে।
প্রতিটি গ্রাহকের প্রয়োজন বুঝে শরিয়াহভিত্তিক আধুনিক সেবা চালু করা হচ্ছে এবং দেশজুড়ে শাখা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
বাংলা ট্রিবিউন: প্রবাসীদের জন্য ইসলামী ব্যাংকের কোনও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: আমরা ১৬ বছর ধরে বেসরকারি খাতে রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষে। প্রবাসীদের জন্য সেলফিন অ্যাপে নিজ নামে ডিপোজিট স্কিম খোলার সুবিধা দিচ্ছি।
নতুন অঞ্চল যেমন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এক্সচেঞ্জ হাউজ ও ফিন্যান্সিয়াল পার্টনারদের সঙ্গে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য—প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ, দ্রুত এবং সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করা।
বাংলা ট্রিবিউন: আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও এসএমই খাতে ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোগ কী?
মো. ওমর ফারুক খাঁন: আমরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। নতুন শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট বাড়ানো হচ্ছে।
পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে নারী, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষকে শরী‘আহভিত্তিক বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা চালু রয়েছে। এসবের মাধ্যমে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনে কাজ করছি।