সরকারের এক ঘোষণায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ইসলামী ব্যাংক, ফিরছে আস্থা

গোলাম মওলা
০১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৭আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৭

দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অন্যতম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি কয়েক সপ্তাহ আগেও নজিরবিহীন আস্থা সংকটের মধ্যে পড়েছিল। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, একটি ব্যাংকের পে-অর্ডার অন্য ব্যাংক গ্রহণ করছিল না, আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম আরটিজিএস কার্যত অচল হয়ে পড়ে, গ্রাহকরা নিজেদের জমা রাখা অর্থও প্রয়োজনমতো তুলতে পারছিলেন না। অনেক শাখায় এক লাখ টাকার বেশি উত্তোলন সীমিত হয়ে যায়। এতে শুধু একটি ব্যাংক নয়, পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপরই আস্থার সংকট তৈরি হয়।

ব্যাংকারদের ভাষায়, দেশের আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি যদি কার্যত অচল হয়ে যেত, তাহলে তার অভিঘাত গোটা অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ত। কারণ ইসলামী ব্যাংকের রয়েছে কোটি কোটি গ্রাহক, বিশাল আমানতভিত্তি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক।

কীভাবে শুরু হলো সংকট

ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৪ মে এস আলম গ্রুপের সুবিধাভোগী হিসেবে বিতর্কিত খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এই নিয়োগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম।

এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ইসলামী ব্যাংকসংক্রান্ত বক্তব্যের পর। সেই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। অনেক আমানতকারী দ্রুত টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে ব্যাংকে তারল্য সংকট আরও তীব্র হয়।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ইসলামী ব্যাংকের পে-অর্ডার অনেক ব্যাংক নগদায়ন করছিল না, আরটিজিএসের মাধ্যমে লেনদেন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল এবং গ্রাহকদের বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনও সীমিত হয়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জরুরি হস্তক্ষেপ

সংকট গভীর হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করে। প্রথমে বিতর্কিত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে অপসারণ করা হয়। পরে পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে চেয়ারম্যান এবং আশরাফুল আলমকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটির কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে।

একইসঙ্গে ব্যাংকটির তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে নগদ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংক পেলো ১৩ হাজার কোটি টাকার সহায়তা

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংককে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে অনেক বেশি স্পেকুলেশন হচ্ছে। সবাইকে অনুরোধ করব, একটু ধৈর্য ধরুন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করুন।

তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন ব্যাংককে মোট প্রায় ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন ব্যাংককে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিতে হয়েছে।

গভর্নর বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম চার মাস কোনও ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিতে হয়নি। তবে ইসলামী ব্যাংকের বিশেষ পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক একটি ব্যাংকিং কোম্পানি। এটি ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক আইনের বাইরে গিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেবে না।

ধীরে ধীরে ফিরছে আস্থা

ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি এখন আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক হচ্ছে।

গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক কমেছে। আগে যেখানে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল, এখন অনেক শাখা থেকেই এক লাখ, দুই লাখ কিংবা তারও বেশি অর্থ উত্তোলন করা যাচ্ছে।

একইসঙ্গে নতুন আমানতও বাড়ছে। টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমে এসেছে। দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রমও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে।

ব্যাংকারদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তদারকি এবং তারল্য সহায়তার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

১৮(ক) ধারা বাতিল, এস আলমের ফেরার পথ কার্যত বন্ধ

ইসলামী ব্যাংকসহ একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বহুল আলোচিত ১৮(ক) ধারা।

এই ধারার মাধ্যমে আগের মালিকরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে আবার ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ পেতে পারতেন।

কিন্তু অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, সরকার ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি বলেন, "যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একীভূত হওয়া কোনো দুর্বল ব্যাংকের আগের মালিকরা আর ব্যাংকের মালিকানায় ফিরে আসতে পারবেন না।"

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে এস আলম গ্রুপের ব্যাংকিং খাতে পুনঃপ্রবেশের আইনি পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেল।

সচেতন গ্রাহক ফোরামের আন্দোলনের ফল

ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম শুরু থেকেই সাত দফা দাবি তুলে আন্দোলন করে আসছে।

তাদের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল— বিতর্কিত চেয়ারম্যান অপসারণ; নিরপেক্ষ ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন; এস আলমের প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা; ব্যাংক লুটেরাদের বিচার; বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা; ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল; আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

সংগঠনটির নেতারা বলছেন, চেয়ারম্যান অপসারণ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ১৮(ক) ধারা বাতিল—এই তিনটি বড় দাবি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে।

ব্যাংক নিয়ে রাজনীতি নয়

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট তৎপরতা বরদাশত করা হবে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। তাই দ্রুত সৎ, যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা দিয়েই ইসলামী ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটবে না।

প্রকৃত সংস্কারের জন্য প্রয়োজন— খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা শক্তিশালী করা, পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

তাদের মতে, সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে ইসলামী ব্যাংকের প্রতি জনগণের পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, বিতর্কিত চেয়ারম্যান অপসারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা, নতুন তদারকি ব্যবস্থা এবং ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিল—এই চারটি বড় পদক্ষেপ ইসলামী ব্যাংকের সংকট মোকাবিলায় একটি নতুন মোড় তৈরি করেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ইতিবাচক ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ব্যাংকটিকে একটি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও আস্থাভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।

/এম/
সম্পর্কিত
ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ বিতর্ক: গয়েশ্বরের অভিযোগের জবাব দিলেন পার্থ-শাহজাহান
২৭ জুনের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি
২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠনের দাবি 
সর্বশেষ খবর
হোলি আর্টিজান হামলা: অপেক্ষা আপিল বিভাগের শুনানির
হোলি আর্টিজান হামলা: অপেক্ষা আপিল বিভাগের শুনানির
এরদোয়ানকে ‘শান্ত হতে’ বললেন নেতানিয়াহু
এরদোয়ানকে ‘শান্ত হতে’ বললেন নেতানিয়াহু
ইকুয়েডরের স্বপ্ন ভেঙে শেষ ষোলোয় মেক্সিকো
ইকুয়েডরের স্বপ্ন ভেঙে শেষ ষোলোয় মেক্সিকো
ড্রয়ারে পড়ে ছিল অ্যান্টার্কটিকার ডাইনোসরের বিরল জীবাশ্ম
ড্রয়ারে পড়ে ছিল অ্যান্টার্কটিকার ডাইনোসরের বিরল জীবাশ্ম
সর্বাধিক পঠিত
খামেনির জানাজায় অংশ নেবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন
খামেনির জানাজায় অংশ নেবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন
ভারতীয় ভিসা আবেদনে ‘টাইম স্লট’ নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
ভারতীয় ভিসা আবেদনে ‘টাইম স্লট’ নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
নতুন মুরগি বাজারে আসছে, মাংস হবে লাল, ডিম পাড়বে বেশি
নতুন মুরগি বাজারে আসছে, মাংস হবে লাল, ডিম পাড়বে বেশি
বিশ্বাস করে বাসার চাবিও দিয়েছিলেন নারী, তাকেই হত্যা করলেন মুয়াজ্জিন
টাঙ্গাইলে নাজমা আলম হত্যার রহস্য উন্মোচনবিশ্বাস করে বাসার চাবিও দিয়েছিলেন নারী, তাকেই হত্যা করলেন মুয়াজ্জিন
ইরানের আমন্ত্রণ পেয়েও কেন খামেনির জানাজায় যাচ্ছেন না মোদি
কী, কেন, কীভাবেইরানের আমন্ত্রণ পেয়েও কেন খামেনির জানাজায় যাচ্ছেন না মোদি