জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাত—রাজনৈতিক ভাষায় যাকে অনেকে বলেন ‘সাইলেন্ট পিরিয়ড’। এ রাতেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় নগদ অর্থ ছড়ানোর অভিযোগে উত্তাপ ছড়িয়েছে নির্বাচনি মাঠে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাত পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে, কিংবা নির্দিষ্ট ভোটার গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে টাকা বিতরণের চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগ এসেছে একাধিক জেলা থেকে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত কয়েকজন প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।
প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন বলছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—ভোটের আগের রাতের এই ‘টাকা ছিটানো’ আসলে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে ভোটের ফলাফলে?
গ্রামে-শহরে নগদের অস্বাভাবিক চলাচল
নির্বাচনকে ঘিরে গত দুই মাসে নগদ অর্থের চলাচল অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ব্যাংকের বাইরে নগদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা— যা দুই মাসে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনি অর্থচক্রের একটি বড় অংশই নগদভিত্তিক, যার প্রতিফলন এই পরিসংখ্যানে স্পষ্ট।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটিএম বুথ ও কাউন্টার থেকে নগদ উত্তোলন বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ পর্যন্ত। রাজধানী ও বড় শহর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ায় ব্যক্তিগত খরচ বেড়েছে— যাতায়াত, পারিবারিক ব্যয়, স্থানীয় বাজারে কেনাকাটা। পাশাপাশি প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা, কর্মী সমন্বয়, যানবাহন ও খাদ্য ব্যয় মিলিয়ে নির্বাচনি মাঠে নগদের প্রবাহ দ্রুতগতিতে বেড়েছে।
অভিযোগ: ২০০-৩০০ টাকায় ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা
বগুড়াসহ কয়েকটি জেলায় অভিযোগ উঠেছে, দিনমজুর, দরিদ্র ও সংখ্যালঘু নারীদের ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে নগদ বিতরণের চেষ্টা হয়েছে। কোথাও কোথাও এ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষও হয়েছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেষ মুহূর্তে নগদ বিতরণ ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করার কৌশল। এটি শুধু আইন লঙ্ঘনের প্রশ্ন নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার জন্যও বড় ঝুঁকি।
আইনের সীমা কোথায়?
সংসদ নির্বাচনের আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর ২২(৩) ধারায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা এবং প্রার্থীর ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকার বেশি নির্বাচনি ব্যয় ব্যাংকিং মাধ্যমে সম্পাদন করতে হবে। অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার বাইরে নগদ লেনদেন নিরুৎসাহিত এবং সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে ব্যক্তিগতভাবে নগদ বহনের ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নির্বাচনকালে কোটি টাকা বহনে আইনগত বাধা নেই
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য যেকেউ যে পরিমাণ টাকা সঙ্গে রাখতে চান, তা আইনগতভাবে সম্ভব। কেউ যদি কোটি টাকা বহন করেন, তাতেও কোনও সমস্যা নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে টাকার উৎস ও ব্যবহার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারে। যদি টাকার মালিক প্রমাণ দিতে পারেন যে, টাকা কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে, এতে কর্তৃপক্ষ যদি সন্তুষ্ট হয়, সেক্ষেত্রেও কোনও বাধা নেই।” তিনি আরও জানান, সাধারণত ৫০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়, যেমন- চেক বা ব্যাংক ট্রান্সফার।
তিনি উল্লেখ করেন, ঠাকুরগাঁওয়ে আটক ওই ব্যক্তির দায়িত্ব এখন—নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ৫০ লাখ টাকা তিনি কোথায় ব্যবহার করবেন, তা পরিষ্কার করা।
একইভাবে ভোটের সময় নগদ টাকা বহনের কোনও নির্দিষ্ট সীমা নেই বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, ‘‘সোর্স এবং ব্যবহারের বৈধ খাত দেখাতে পারলে ৫০ লাখ নয়, প্রয়োজনে ৫ কোটি টাকা বহন করলেও কোনও সমস্যা হবে না।’’
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) ইসি সচিব এ তথ্য সাংবাদিকদের জানান। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, যদি কোনও টাকা ভোটে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়, তা ‘নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি’ দেখবে। অপরদিকে, অবৈধ অর্থ বহন বা ব্যবহার করা হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। ইসি সচিব বলেন, ‘‘ব্যক্তিগত কাজে টাকা বহনের ক্ষেত্রে কোনও সীমা নেই, তবে তার উৎস এবং ব্যবহার বৈধ হতে হবে।’’
আলোচনায় ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনা
নগদ বহন নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঠাকুরগাঁওয়ে। সৈয়দপুর বিমানবন্দর থানা পুলিশ ৭৪ লাখ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিনকে আটক করেছে। প্রথমে ৫০ লাখ বলা হলেও পরে গণনায় তার কাছে ৭৪ লাখ টাকা পাওয়া যায়।
বেলাল উদ্দিন দাবি করেছেন, এটি তার গার্মেন্টস ব্যবসার অর্থ। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী এই ঘটনাকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাটক’ বলে দাবি করেছে। এদিকে কুমিল্লার মুরাদনগরে নগদ দুই লাখ টাকাসহ মাওলানা হাবীবুর রহমান হেলালী নামের এক জামায়াত নেতাকে আটক করেছেন স্থানীয়রা। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে আটক করে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করেছে সেনাবাহিনী। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, টাকাগুলো এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর।
এই ঘটনাগুলো নির্বাচনি মাঠে নগদ অর্থের প্রবাহ ও ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
নগদ টাকা প্রদান, ভোটে কতটা প্রভাব ফেলে?
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প অঙ্কের নগদ অর্থ দরিদ্র ভোটারদের তাৎক্ষণিক প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ২০০-৩০০ টাকাও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে জাতীয় পর্যায়ে বড় ব্যবধানে ফল নির্ধারণে কেবল ‘টাকা ছিটানো রাত’ এককভাবে নির্ণায়ক হয়ে ওঠে না।
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভোটের আচরণ এখন বহুস্তরীয়—দলীয় পরিচয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, জাতীয় ইস্যু, অর্থনৈতিক বাস্তবতা— সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেন ভোটাররা। নগদ প্রণোদনা সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরি করে না।
তবে এর নেতিবাচক দিক হলো— এটি নির্বাচনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ণ করে। যখন ভোটাররা মনে করেন অর্থের প্রভাব আছে, তখন গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
প্রশাসনের নজরদারি ও চ্যালেঞ্জ
সরকারি সূত্র বলছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশন অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
তবুও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে— কারণ নগদ অর্থের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে লেনদেন হয়, যা নজরদারির বাইরে থাকে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) লেনদেনে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে অনেক ক্ষেত্রে নগদের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের আগের রাতের ‘টাকা ছিটানো’ রাজনীতির পুরোনো কৌশল হলেও এর প্রভাব এখন আর একমাত্র নির্ধারক নয়। তবে এটি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে যথেষ্ট।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটারদের আস্থা ও নির্বাচনের স্বচ্ছতা সবচেয়ে বড় বিষয়। নগদ অর্থের অস্বাভাবিক প্রবাহ সেই আস্থায় ফাটল ধরাতে পারে। তাই প্রার্থীদের জন্য বার্তা স্পষ্ট— নির্ধারিত সীমার মধ্যে স্বচ্ছ লেনদেনই হতে পারে টেকসই রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি।