শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ

এমপিদের গাড়ি আমদানিতেও বসবে কর 

সরকার আসন্ন জাতীয় বাজেট অধিবেশনে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সুবিধা— সংসদ সদস্যদের (এমপি) শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি করার সুযোগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুবিধা সীমিত করার মাধ্যমে কর নীতি সংস্কারের প্রতিফলন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতা এবং সমান করনীতি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির অংশ। বছরের পর বছর এই সুবিধার অপব্যবহার এবং সরকারি রাজস্বে ক্ষতির কারণে এর ওপর সমালোচনা বেড়েছে।

তিনি জানিয়েছেন, এই বিতর্কিত সুবিধা, যা ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট (রেমুনেরেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার, ১৯৭৩’- এর আওতায় এমপিদের দেওয়া হয়, প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধনের মাধ্যমে বাতিল করা হবে।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, “আমাদের ক্ষমতায় থাকার সময় এটি স্থায়ীভাবে বাতিল থাকবে।” তিনি আরও বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দলের নীতি প্রতিফলিত করছে।

উল্লেখ্য, দায়িত্ব গ্রহণের পরই সরকার ঘোষণা দেয় যে, তাদের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি কিংবা প্লট সুবিধা গ্রহণ করবেন না। একইভাবে, এর আগে, জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনি প্রচারণার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তাদের এমপিরা এই ধরনের সুবিধা গ্রহণ করবেন না।

যদিও বিদ্যমান আইনের আওতায় এখনও সংসদ সদস্যদের জন্য এ সুবিধা বহাল রয়েছে এবং ইচ্ছা করলে তা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

বর্তমান বিধান অনুযায়ী, এমপিরা এক মেয়াদের জন্য একটি গাড়ি— কার, জিপ বা মাইক্রোবাস শুল্কমুক্ত, ভ্যাটমুক্ত, উন্নয়ন শুল্কমুক্ত এবং আমদানির অনুমতি ফি ছাড়া আমদানি করতে পারবেন।

অপরদিকে, সাধারণ আমদানিকারকদের জন্য মোট করের বোঝা প্রায় ২৫ শতাংশ শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং ৪০০ থেকে ৫০০ মতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক গুনতে হচ্ছে।

কেন এই সিদ্ধান্ত?

অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধাটি বহু বছর ধরেই অপব্যবহারের অভিযোগে সমালোচিত ছিল। বিলাসবহুল গাড়ি যেমন- রোলস-রয়েস বা মার্সিডিজ বেঞ্জ—এই সুবিধার আওতায় আমদানির একাধিক নজির সামনে এসেছে।

সরকারের একটি টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু ২০২২-২৩ অর্থবছরেই এই সুবিধার কারণে প্রায় ৬৮৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। ফলে রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থ রক্ষা এবং কর ব্যবস্থাকে ন্যায্য করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, “জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। করের ক্ষেত্রে সবাইকে সমানভাবে বিবেচনা করা উচিত।”

আইনি প্রেক্ষাপট

বর্তমানে ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট (রেমুনেরেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার, ১৯৭৩’ অনুযায়ী এমপিরা তাদের মেয়াদকালে একটি গাড়ি শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করতে পারেন। এতে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, অগ্রিম কর— সবকিছু থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সাধারণ আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে একই ধরনের গাড়ি আমদানিতে মোট করের হার ৪০০-৫০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এই বিশাল পার্থক্য কর ব্যবস্থায় বৈষম্যের একটি বড় উদাহরণ।

অতীতের বিতর্ক ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা

শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা প্রথম চালু হয়  এরশাদ সরকারের আমলে। পরবর্তী বছরগুলোতে এটি নিয়ে বিভিন্ন সময় সমালোচনা হলেও কার্যকরভাবে বাতিল করা যায়নি। গত অর্থবছরে নানা চেষ্টার পরও সফল হয়নি। বাজেটে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব থাকলেও পরবর্তীকালে অর্থ বিল থেকে তা বাদ দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ প্রায় ৩৬ বছর ধরে ভোগ করা সংসদ সদস্যদের গাড়ি আমদানিতে পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা আংশিকভাবে প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে। এতে প্রথমবারের মতো এ সুবিধার কাঠামোয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৪ সালে মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তে সংসদ সদস্যদের সুবিধা কিছুটা প্রত্যাহারের উদ্যোগ ছিল। ২০২৪ সালের ৬ জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এই সুবিধা সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট/মূসক) ১৫ শতাংশ আরোপের সুপারিশ করা হয়। তবে সংসদ সদস্যদের আপত্তির মুখে তা অনুমোদিত হয়নি।

এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলীয় পর্যায় থেকেই এই সুবিধা পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা এসেছে, যা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। এ সুবিধা পুরোপুরি বাতিল করতে বিদ্যমান আইনে কিছু সংশোধন প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত বছর থেকেই বিভিন্ন খাতে দেওয়া অব্যাহতির সুযোগ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হচ্ছে। তবে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিলের ক্ষেত্রে আগে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এ বিষয়ে যদি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসে, তাহলে আসন্ন বাজেটে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালের ২৪ মে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৎকালীন সরকার সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও কর অব্যাহতির সুবিধা চালু করেছিল, যা টানা কয়েক দশক ধরে বহাল রয়েছে।

২০০৭ সালে ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের জরুরি অবস্থা সরকারের সময় এই শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা নিয়ে নানা কেলেংকারির খবর সামনে আসে, তখন সরকারি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সুবিধাটি বাতিলের চেষ্টা করা হলেও পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। পরবর্তী ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবার এই সুবিধা পুনরায় চালু করে।

একটি গাড়ি আমদানির মাধ্যমেই ৫ কোটি ফাঁকি

সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা আবারও আলোচনায় এসেছে, কারণ একটি মাত্র গাড়ি আমদানির মাধ্যমেই ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ির ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) মিলিয়ে মোট করের পরিমাণ গাড়ির মূল্যের সমান বা তারও বেশি হতে পারে। ফলে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলে একজন এমপি একবার গাড়ি আমদানি করেই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পরিহার করতে পারেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সুবিধা কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে একটি কাঠামোগত বৈষম্য তৈরি করেছে। যেখানে সাধারণ নাগরিকদের একই ধরনের গাড়ি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ কর পরিশোধ করতে হয়, সেখানে জনপ্রতিনিধিরা সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধা ভোগ করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অতীতে এই সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগও ছিল। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকানা, ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং পুনর্বিক্রির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে লাভবান হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

কতটা অপব্যবহার হয়েছে?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৫৭২টি গাড়ি শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা হয়েছে। এসব গাড়ির মোট কাস্টমস মূল্য প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকা হলেও শুল্ক ও কর ছাড়ের পর ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৫,১৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, রাজস্বের ক্ষতি প্রায় ১৩ গুণ।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ

দ্বাদশ সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর এনবিআর প্রায় ৩০টি শুল্কমুক্ত গাড়ি ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে এসব গাড়ি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যানবাহন পুলে স্থানান্তর করা হয়।

এই গাড়িগুলোর ওপর মোট বকেয়া করের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬৯ কোটি টাকা। প্রতিটি গাড়ির কর দায় ছিল প্রায় ৮ কোটি ৬২ লাখ থেকে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার মধ্যে।

পরবর্তীকালে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর আওতায় এসব গাড়ি নিলামে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত দর পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক ও নীতিগত তাৎপর্য

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তকে একটি ‘নীতিগত টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ এটি জনগণকে স্পষ্ট বার্তা দেয়—জনপ্রতিনিধিরাও বিশেষ সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। এটি কর ব্যবস্থায় সমতা প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সুরক্ষা এবং জনআস্থার পুনর্গঠনেও সহায়ক।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান

নতুন ত্রয়োদশ সংসদে বিএনপি জয়ী সংসদ সদস্যরা সরকারি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানিয়েছেন, শপথ নেওয়ার পর দলীয় সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তাদের সংসদ সদস্যরা কোনোভাবেই শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট গ্রহণ করবেন না। তিনি বলেন, ‘‘রাজনীতিকে তারা পেশা নয়, বরং দায়িত্ব হিসেবে নেবে।’’

আগামী চ্যালেঞ্জ

এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো— এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা বজায় থাকবে কি না এবং আইনি সংশোধন কত দ্রুত সম্পন্ন হয়। যদি এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু সুবিধা বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাংলাদেশের করনীতি ও সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।