সঞ্চয়পত্রে কাটা কর ফেরত পাবেন কারা? রিটার্ন দেওয়ার আগে জেনে নিন নতুন নিয়ম

গোলাম মওলা
১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২

চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য এসেছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন। প্রথমবারের মতো সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে রাখা উৎসে কর (অগ্রিম কর) বছর শেষে আয়করের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে। প্রযোজ্য করের চেয়ে বেশি কর কাটা হলে সেই অতিরিক্ত অর্থ ফেরতও পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে একই সঙ্গে সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে পাওয়া কর রেয়াতের সুবিধা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে একদিকে কর ফেরতের সুযোগ তৈরি হলেও অন্যদিকে অনেক করদাতার করের বোঝা বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে এবার রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে জানা প্রয়োজন।

সঞ্চয়পত্রের কাটা কর আর চূড়ান্ত কর নয়

এতদিন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে যে কর কাটা হতো, সেটিই ছিল চূড়ান্ত করদায়। অর্থাৎ পরে ওই আয়ের জন্য আর আলাদা হিসাব করতে হতো না। নতুন ব্যবস্থায় সেই নিয়ম পরিবর্তন হয়েছে। এখন উৎসে কাটা করকে অগ্রিম কর হিসেবে ধরা হবে। বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় মোট আয়ের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা যোগ করে প্রকৃত কর নির্ধারণ করা হবে। এরপর উৎসে কাটা কর সেই করের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

ফলে কারও বেশি কর কাটা হয়ে থাকলে তিনি সেই অর্থ ফেরত পাবেন। আবার কারও প্রকৃত কর বেশি হলে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে।

কীভাবে অতিরিক্ত কর ফেরত পাওয়া যাবে

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি সারা বছরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে ৩০ হাজার টাকা উৎসে কর দিয়েছেন। কিন্তু সব ধরনের কর ছাড় ও হিসাব শেষে দেখা গেল, তার প্রকৃত করদায় ২০ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে বাকি ১০ হাজার টাকা সরকার ফেরত দেবে।

তবে এই অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে না। করদাতাকে অবশ্যই আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং সেখানে ব্যাংক হিসাব নম্বর দিয়ে ফেরতের আবেদন করতে হবে। কর কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই অর্থ ব্যাংক হিসাবে পাঠিয়ে দেবেন।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে ১২০ দিনের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা।

কর ফেরত পেতে লাগবে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজ

কর সমন্বয় বা ফেরতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হচ্ছে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কাটা উৎসে করের প্রত্যয়নপত্র।

এ জন্য জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেটে রাখা উৎসে করের প্রত্যয়নপত্র বিতরণ শুরু করেছে। জেলা সঞ্চয় অফিস, ব্যুরো ও বিশেষ ব্যুরো অফিস থেকে এই সনদ সংগ্রহ করা যাচ্ছে।

রিটার্নের সঙ্গে এই প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। এটিই হবে উৎসে কর কাটা হওয়ার সরকারি প্রমাণ।

ছোট বিনিয়োগকারীদেরও রিটার্ন দিতে হতে পারে

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের একটি হলো—অনেক ছোট বিনিয়োগকারীও এখন রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য হতে পারেন। যাদের করযোগ্য আয় নেই, কিন্তু সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছে, তারাও সেই টাকা ফেরত পেতে চাইলে রিটার্ন দিতে হবে।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন বাধ্যতামূলক। ফলে টিআইএনধারী অনেক ব্যক্তি, যাদের প্রকৃতপক্ষে কর দেওয়ার মতো আয় নেই, তারাও শুধু কেটে রাখা কর ফেরত পাওয়ার জন্য রিটার্ন দাখিল করবেন।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার অপরিবর্তিত

এদিকে সরকার আগামী জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রেখেছে।

বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ মুনাফার হার প্রায় ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের নির্ভরতার কথা বিবেচনায় নিয়ে এই হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

কর রেয়াত কমছে

শুধু কর সমন্বয়ের নিয়মই নয়, এবার বিনিয়োগের বিপরীতে কর ছাড় বা কর রেয়াতের সুবিধাও কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে সঞ্চয়পত্র, জীবন বীমা, ডিপিএসসহ কয়েকটি খাতে বিনিয়োগের ওপর করদাতারা কর রেয়াত পান। বিদ্যমান নিয়মে অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর রেয়াত হিসাব করা হয় এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ এই সুবিধার আওতায় থাকে।

নতুন প্রস্তাবে এই সীমা কমিয়ে অনুমোদিত বিনিয়োগের ১০ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

অর্থাৎ আগের তুলনায় একই পরিমাণ বিনিয়োগ করলেও কর ছাড় কম পাওয়া যাবে।

তবে কর রেয়াতের আওতাভুক্ত খাতগুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সঞ্চয়পত্র, জীবন বীমা, ডিপিএসসহ আগের খাতগুলোতেই কর রেয়াত মিলবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিপিএসে বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ওপর আগের মতো কর রেয়াত পাওয়া যাবে।

৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রধারীরও কর বাড়তে পারে

নতুন ব্যবস্থায় আগে যাদের করদায় তুলনামূলক কম ছিল, তাদের অনেকের করও বাড়তে পারে।

আগে ১০ লাখ টাকার নিচে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থাকলে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে সেটিকেই চূড়ান্ত কর হিসেবে ধরা হতো।

এখন সেই সুবিধা থাকছে না। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির করস্ল্যাব যদি ১০ শতাংশ বা তার বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে।

আগে রিটার্ন দিলে মিলবে কর ছাড়

এবার থেকে বছরজুড়েই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। তবে আগে রিটার্ন দিলে করদাতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা দিলে নির্ধারিত করের ওপর ৫ শতাংশ কর প্রণোদনা, তবে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা। দ্বিতীয় ধাপে ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের জমা দিলে কোনো প্রণোদনা বা জরিমানা নেই। 

১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে জমা দিলে ২ শতাংশ জরিমানা, সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা। আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে জমা দিলে ৫ শতাংশ জরিমানা, সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা।

নতুন করদাতাদের জন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত রাখা হয়েছে। অবশ্য নতুন অর্থবছর শুরু হলেও এখনও ব্যক্তি করদাতাদের অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল কার্যক্রম শুরু হয়নি। গত অর্থবছরে পাঁচটি নির্দিষ্ট শ্রেণি ছাড়া সব ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এবার সেই ব্যবস্থার আরও সম্প্রসারণ হচ্ছে। চলতি অর্থবছর থেকে ব্যক্তি করদাতাদের পাশাপাশি কোম্পানি বা করপোরেট করদাতাদের জন্যও প্রথমবারের মতো অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে এনবিআর।

তবে নতুন এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের কার্যক্রম চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে শুরু হতে পারে বলে এনবিআরের একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সাধারণ মানুষের জন্য কী বার্তা?

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন সেইসব ব্যক্তি, যাদের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে নিয়মিত উৎসে কর কাটা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত করদায় তুলনামূলক কম। তারা এখন অতিরিক্ত কাটা কর ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

অন্যদিকে যাদের আয় বেশি এবং সঞ্চয়পত্র থেকে উল্লেখযোগ্য সুদ আয় হয়, তাদের অনেকের করের পরিমাণ আগের তুলনায় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত কমে যাওয়ায় উচ্চ আয়ের করদাতাদের কর সাশ্রয়ের সুযোগও সীমিত হবে।

সব মিলিয়ে এবার রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের উৎসে করের প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ, আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব প্রস্তুত এবং কর সমন্বয়ের বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ সামান্য সচেতনতাই অনেকের ক্ষেত্রে হাজার হাজার টাকা ফেরত এনে দিতে পারে, আবার ভুল হিসাবের কারণে অতিরিক্ত করও গুনতে হতে পারে।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
সঞ্চয়পত্রের সুদ হার নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত 
প্রথমবার রিটার্নে ন্যূনতম কর ১ হাজার টাকা, জুলাই-সেপ্টেম্বরে দিলে থাকছে ছাড় 
অডিটের নামে করদাতাদের কাছে অর্থ চেয়ে প্রতারণা, সতর্ক করলো এনবিআর
সর্বশেষ খবর
এস আলম-পি কে হালদারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পরবর্তী সাক্ষ্য ৯ আগস্ট
৩৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলাএস আলম-পি কে হালদারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পরবর্তী সাক্ষ্য ৯ আগস্ট
স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণ বিষয়ে যা বললেন রিজভী
স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণ বিষয়ে যা বললেন রিজভী
শিরোপা লড়াইয়ের আগে মেসির শেষ বার্তা
শিরোপা লড়াইয়ের আগে মেসির শেষ বার্তা
নোবেলজয়ী ল্য ক্লেজিওর ‘যে কখনো সমুদ্র দেখেনি’ বইয়ের প্রকাশনা
নোবেলজয়ী ল্য ক্লেজিওর ‘যে কখনো সমুদ্র দেখেনি’ বইয়ের প্রকাশনা
সর্বাধিক পঠিত
মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জন, আলোচনায় যারা
মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জন, আলোচনায় যারা
নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারের প্রশ্নে যা বললেন মামদানি
নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারের প্রশ্নে যা বললেন মামদানি
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, কারা দিলো কীভাবে?
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, কারা দিলো কীভাবে?
২৭ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি বর্ণার, নদীর পাড়ে বসে কাঁদছেন বাবা
২৭ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি বর্ণার, নদীর পাড়ে বসে কাঁদছেন বাবা
সচিবকে লেখা চিঠিতে ‘আপনার আস্থাভাজন’ কেন লিখছেন এমপিরা
সচিবকে লেখা চিঠিতে ‘আপনার আস্থাভাজন’ কেন লিখছেন এমপিরা