বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, রেমিট্যান্স এবং সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শুধু প্রচলিত খাতের ওপর নির্ভর করে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস খুঁজতে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও এখন নজর দিচ্ছে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির দিকে।
সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, আসন্ন বাজেটে এই খাতের জন্য ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনেরও পরিকল্পনা রয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সরকারের এমন আগ্রহের পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ আসলে কী? এটি কীভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখে? আর বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্বই বা কোথায়?
সৃজনশীলতা যখন অর্থনৈতিক সম্পদ
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি, উদ্ভাবন ও কল্পনাশক্তিকে পণ্য বা সেবায় রূপান্তর করে আয়, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করার প্রক্রিয়াই হলো ক্রিয়েটিভ ইকোনমি।
একজন সংগীতশিল্পী গান তৈরি করলেন, যা কোটি মানুষ অনলাইনে শুনলো। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা সিনেমা বানিয়ে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করলেন, একজন তরুণ মোবাইল গেম তৈরি করে বিদেশে বাজার পেলেন, একজন ইউটিউবার বা ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা বিজ্ঞাপন থেকে আয় করলেন, কিংবা কোনও কারুশিল্পী নকশিকাঁথা বা মাটির তৈরি পণ্য বিদেশে রফতানি করলেন—এসবই সৃজনশীল অর্থনীতির উদাহরণ।
অর্থাৎ এখানে মূল সম্পদ কোনও কারখানা, জমি বা খনিজ সম্পদ নয়, বরং মানুষের চিন্তা, জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি।
বাজেটে নতুন চমক
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে প্রথমবারের মতো ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েই এই উদ্যোগ।
বাজেটে সম্ভাব্য যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে তার মধ্যে রয়েছে— সৃজনশীল খাতের জন্য বিশেষ তহবিল, ডিজিটাল সেবা ও সৃজনশীল পণ্য রফতানিতে নগদ সহায়তা, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিল, জেলা পর্যায়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ ও ‘ইনোভেশন জোন’, বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃজনশীল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং শিল্প, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ।
সরকারের মতে, এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির নতুন ভিত্তি তৈরির কৌশল।
প্রান্তিক শিল্পী থেকে ডিজিটাল উদ্যোক্তা
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে কামার, কুমার, তাঁতি, কারুশিল্পী, নাট্যকর্মী, সংগীতশিল্পী, চিত্রশিল্পী এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির মূলধারায় আনা হবে।
সরকার মনে করছে, বহু দিন ধরে উপেক্ষিত গ্রামীণ শিল্প ও সংস্কৃতিকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে তা লাখো মানুষের আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা তাঁতশিল্প, জামদানি, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, বাঁশ-বেতের পণ্য, শীতলপাটি কিংবা লোকসংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠারও সুযোগ রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বৈশ্বিক সৃজনশীল অর্থনীতির আকার দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। বিশ্বের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সরাসরি এই খাতের সঙ্গে যুক্ত।
অনেক দেশে জিডিপিতে এ খাতের অবদানও উল্লেখযোগ্য।
- যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪.২ শতাংশ
- ফিলিপাইনে ৭.৩৪ শতাংশ
- ইন্দোনেশিয়ায় ৭.২৮ শতাংশ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার সৃজনশীল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। আগে একজন শিল্পী বা কারুশিল্পীর বাজার সীমাবদ্ধ ছিল স্থানীয় এলাকায়। এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একই পণ্য বিশ্বের যেকোনও প্রান্তে বিক্রি করা সম্ভব।
কোন কোন খাত রয়েছে সৃজনশীল অর্থনীতির আওতায়?
বিশ্বব্যাপী সাধারণত ১৫ থেকে ২০টি খাতকে সৃজনশীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
- চলচ্চিত্র ও নাটক
- সংগীত ও পারফর্মিং আর্টস
- চিত্রকলা ও ভাস্কর্য
- ফ্যাশন ও পোশাক ডিজাইন
- গ্রাফিক্স ও ডিজিটাল ডিজাইন
- বিজ্ঞাপন শিল্প
- প্রকাশনা ও বই
- সফটওয়্যার ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট
- ভিডিও গেমস
- অ্যানিমেশন
- ফটোগ্রাফি
- স্থাপত্য ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন
- লোকশিল্প ও কারুশিল্প
- ক্রীড়া ও বিনোদন শিল্প
- ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণ
এছাড়া ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, স্পটিফাই, গেমিং, ই-স্পোর্টস, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সৃজনশীল সেবাও বর্তমানে এই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের জন্য কেন ‘গেম-চেঞ্জার’?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সৃজনশীল অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, এটি নতুন কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। দেশে প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রচলিত শিল্প খাত পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। ডিজিটাল কনটেন্ট, সফটওয়্যার, গ্রাফিক ডিজাইন, অ্যানিমেশন, গেমিং এবং সৃজনশীল সেবাভিত্তিক শিল্প নতুন কর্মসংস্থানের বড় উৎস হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সৃজনশীল খাতের অনেক কাজ ঘরে বসেই করা সম্ভব। ফলে নারীরা সহজেই এই খাতে যুক্ত হতে পারেন।
তৃতীয়ত, কম বিনিয়োগে বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব। এ ধরনের শিল্পে বড় কারখানা বা বিপুল অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। তুলনামূলক কম বিনিয়োগে উচ্চমূল্যের পণ্য ও সেবা তৈরি করা যায়।
চতুর্থত, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে সফটওয়্যার, ডিজাইন ও ডিজিটাল সেবা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন। সরকারি সহায়তা বাড়লে এই আয় আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে।
পঞ্চমত, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত করা গেলে তা রফতানি আয়ের নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে।
‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেল
সরকার যে ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ ধারণার কথা বলছে, তার মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি অঞ্চলের ঐতিহ্যগত পণ্যকে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা।
যেমন কোনও এলাকায় জামদানি, কোথাও নকশিকাঁথা, কোথাও মৃৎশিল্প বা বাঁশ-বেতের কাজ বিখ্যাত হলে সেই অঞ্চলকে ওই পণ্যের বিশেষায়িত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি পাবে।
‘ক্রিয়েটিভ ডিস্ট্রিক্ট’ কী?
অর্থমন্ত্রী রাজধানীর কাছে একটি ‘ক্রিয়েটিভ ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন।
এ ধরনের এলাকায় শিল্পী, ডিজাইনার, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য একসঙ্গে কাজের পরিবেশ তৈরি করা হয়। সেখানে থাকতে পারে থিয়েটার কমপ্লেক্স, আর্ট গ্যালারি, ডিজাইন স্টুডিও, কনসার্ট ভেন্যু, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার এবং ডিজিটাল মিডিয়া হাব। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে এ ধরনের অঞ্চল স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
সম্ভাবনা বিপুল হলেও বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে।
প্রথমত, কপিরাইট সুরক্ষার দুর্বলতা। বাংলাদেশে পাইরেসি এখনও বড় সমস্যা। মেধাস্বত্ব সুরক্ষা না থাকলে সৃজনশীল মানুষ নিরুৎসাহিত হন।
দ্বিতীয়ত, অর্থায়নের সংকট। ব্যাংকগুলো সাধারণত জমি বা স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক চায়। কিন্তু একজন শিল্পী, ডিজাইনার বা সফটওয়্যার উদ্যোক্তার প্রধান সম্পদ হলো তার আইডিয়া ও মেধা।
তৃতীয়ত, দক্ষতার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল মার্কেটিং এবং কনটেন্ট প্রোডাকশনে দক্ষতা বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, বাজার ও ব্র্যান্ডিংয়ের দুর্বলতা। বাংলাদেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী পণ্য এখনও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।
সৃজনশীলতাই হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি। বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সৃজনশীলতানির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। একসময় অর্থনৈতিক শক্তির মাপকাঠি ছিল জমি, কারখানা বা প্রাকৃতিক সম্পদ। এখন অনেক দেশ মানুষের মেধা ও উদ্ভাবনকেই সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, কারুশিল্প, ডিজিটাল দক্ষতা এবং সৃজনশীল প্রতিভাকে কতটা কার্যকরভাবে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী বাজেটে ঘোষিত সৃজনশীল অর্থনীতির উদ্যোগ যদি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু নতুন কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করবে না; বরং রফতানি আয় বাড়ানো, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির সংকট কাটিয়ে উঠতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী বড় গল্পটি হয়তো তৈরি হবে মানুষের মেধা, সংস্কৃতি, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে ঘিরেই।