দেশের পুঁজিবাজারকে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও আস্থাহীনতার অবস্থা থেকে বের করে আনতে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অতীতের যেকোনও সময়ের তুলনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে আর কোনও ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিএসইসি কার্যালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি পুঁজিবাজার পুনরুদ্ধারের এই রূপরেখা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং নবনিযুক্ত কমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন।
আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের পুঁজিবাজার একদিকে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করলেও অন্যদিকে নানা কাঠামোগত দুর্বলতা ও অনিয়মের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারিয়েছে। এর ফলে বহু বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েছেন, ভালো কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ হারিয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও কমে গেছে।
তার ভাষায়, দেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে বহুগুণ সম্প্রসারিত হলেও পুঁজিবাজার সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। ফলে অর্থনীতির প্রকৃত আকার ও সম্ভাবনার তুলনায় বাজারের গভীরতা এখনও অনেক কম।
ফ্রন্টিয়ার থেকে এমার্জিং মার্কেট
মাসুদ খান বলেন, কমিশনের মূল লক্ষ্য হলো খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীনির্ভর এমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করা।
তার মতে, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার শুধু শেয়ার লেনদেনের জায়গা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান উৎস। তাই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মূলধন আকর্ষণে সক্ষম একটি আধুনিক বাজার গড়ে তুলতে হবে।
কমবে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ
সংবাদ সম্মেলনে বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে বিদ্যমান বিভিন্ন বিধিমালা, রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করা হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আরও সহজ ও কার্যকর করা হবে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবসার ব্যয় বাড়ায় এবং বাজারের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এ জন্য কমিশন ধীরে ধীরে ঝুঁকিভিত্তিক ও নীতিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হবে।
ডিজিটাল হবে পুরো বাজার ব্যবস্থা
সংস্কার পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ডিজিটাইজেশনের ওপর জোর দিয়েছেন নতুন চেয়ারম্যান। তিনি জানান, নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং, তথ্য প্রকাশ, লাইসেন্সিং, অনুমোদন, বাজার তদারকি এবং বিনিয়োগকারী সেবাসহ পুরো পুঁজিবাজার ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হবে।
এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে বলে আশা করছে কমিশন।
ভালো কোম্পানি আনার উদ্যোগ
পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে তালিকাভুক্ত ভালো কোম্পানির ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, দেশের বহু সফল বহুজাতিক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বৃহৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখনও পুঁজিবাজারের বাইরে রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি নতুন মূলধন সংগ্রহ ছাড়াই যোগ্য কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করার সুযোগ দিতে ডাইরেক্ট লিস্টিং কাঠামো চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বিশেষ সুবিধা
তালিকাভুক্তিকে আরও আকর্ষণীয় করতে সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে যৌথভাবে ‘লিস্টেড কোম্পানি অ্যাডভান্টেজ প্রোগ্রাম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।
এ কর্মসূচির আওতায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর সুবিধা বৃদ্ধি, দ্রুত অনুমোদন, সহজ মূলধন সংগ্রহ, ঝুঁকিভিত্তিক কর মূল্যায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় অডিট কমানোর মতো সুবিধা বিবেচনা করা হচ্ছে।
কারসাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
বাজারে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে নজরদারি ও আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ঘোষণা দিয়েছেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই এবং সিডিবিএলের সমন্বয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, ফ্রন্ট রানিং এবং পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প স্কিমের মতো কারসাজিমূলক কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কমিশনের কাজ শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা নয়; বরং বাজারে তথ্যের সমান প্রাপ্যতা ও ন্যায্য লেনদেন নিশ্চিত করা। শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করবে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ, কোনও গোষ্ঠীর কারসাজি নয়।
ফ্লোর প্রাইস থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতি
বিএসইসি চেয়ারম্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাগুলোর একটি ছিল ফ্লোর প্রাইস বিষয়ে অবস্থান। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইস কোনো কার্যকর বাজারব্যবস্থা নয়। এটি বাজারের স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
তাই ভবিষ্যতে নতুন করে কোনও ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হবে।
আস্থা ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন চেয়ারম্যানের ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কাটিয়ে পুঁজিবাজারে নতুন গতি ফিরতে পারে। তবে কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এ প্রসঙ্গে মাসুদ খান বলেন, আস্থা কোনও বক্তৃতা বা প্রশাসনিক নির্দেশে তৈরি হয় না। আস্থা তৈরি হয় ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাজার কারসাজি নিয়ন্ত্রণ– এই চারটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।