পূর্ববর্তী সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে সংঘটিত কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই সঙ্গে সাবেক নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আজীবন বা নির্দিষ্ট মেয়াদের নিষেধাজ্ঞা, লাইসেন্স বাতিল, মামলা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রবিবার (১২ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য কামরুল হাসানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বেক্সিমকো শেয়ার লেনদেনে কারসাজির ঘটনায় ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ৪২৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, আইএফআইসি গ্যারান্টেড শ্রীপুর টাউনশিপ গ্রিন জিরো কুপন বন্ড-সংক্রান্ত তদন্তে শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেডের ১ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যুতে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান এবং সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে আজীবনের জন্য পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সালমান এফ রহমানকে ১০০ কোটি এবং আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে ৫০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এছাড়া বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে আজীবন এবং সাবেক কমিশনার ড. শামসুদ্দিন আহমেদকে পাঁচ বছরের জন্য পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ারকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইএফআইসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আহমেদকে পাঁচ বছরের জন্য পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, রিং শাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড থেকে মূলধন প্রত্যাহার-সংক্রান্ত অনিয়মের তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একইভাবে সিএপিএম অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া শারমিন এবং এএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব এইচ. মজুমদারকে পাঁচ বছরের জন্য পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেডের মাধ্যমে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ২৫ শতাংশ শেয়ার কৌশলগত অংশীদার হিসেবে অধিগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
এছাড়া অ্যাকমি পেস্টিসাইডস লিমিটেড, আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এমারাল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস লিমিটেড এবং বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল-ইস্তিসনা-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে বিএসইসি শাস্তিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এসব ঘটনায় অনিয়ম ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে বিএসইসি দুদকে চিঠি পাঠিয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ব্যাংকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং মশিউর সিকিউ লিমিটেডের ব্রোকারেজ লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে দুদকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি জানান, বিএসইসি পুনর্গঠন করে একজন চেয়ারম্যান ও তিনজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও একজন সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, তাদের কাউকেই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নিয়োগ প্রক্রিয়া এতটাই স্বচ্ছ ছিল যে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমিও আগে থেকে তাদের ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না।
তিনি বলেন, পুনর্গঠিত কমিশনের সব সদস্যই পুঁজিবাজার ও আন্তর্জাতিক মূলধনবাজারে অভিজ্ঞ পেশাজীবী। তাই তাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
আমির খসরু বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পুঁজিবাজার ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। গত দুই মাসে সূচকের যে অগ্রগতি হয়েছে, তা আগের পাঁচ বছরের তুলনায় বেশি। অধিকতর স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসাই এর মূল কারণ।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের সুশাসন ও বিশ্বাসযোগ্যতা জোরদারে সরকার বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে এবং তা অব্যাহত থাকবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু দেশীয় বিনিয়োগকারী নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজারদের মধ্যেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে আস্থা ফিরেছে। হংকং, নিউইয়র্ক ও লন্ডনসহ বিশ্বের প্রধান আর্থিক কেন্দ্রের বিভিন্ন ফান্ড ম্যানেজার বাংলাদেশ সফর করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নির্ভরযোগ্য বাজারে পরিণত হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও শেয়ারের দাম বৃদ্ধিও সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন।









