এক খাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বরাদ্দ, কারণ কী

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দেশের অবদান নগণ্য হলেও ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, তাপপ্রবাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার বিস্তারের মতো বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে দেশের কোটি কোটি মানুষকে। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করেছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের ইতিহাসে জলবায়ু খাতে অন্যতম বৃহৎ বরাদ্দ।

তবে এই ইতিবাচক উদ্যোগের মাঝেও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় সামনে এসেছে। জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বাড়লেও স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অবকাঠামো নির্মাণ বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতকে সমান গুরুত্ব না দিলে জলবায়ু অভিযোজনের সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

জলবায়ু বাজেটে নতুন উচ্চতা

রবিবার (৭ জুন) শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তাবিত ৫২ হাজার কোটি টাকার বড় অংশ ব্যয় হবে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিতে অভিযোজন প্রযুক্তি এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি মোকাবিলা এখন আর কেবল পরিবেশগত কর্মসূচি নয়—এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার বিস্তারের ফলে কৃষি উৎপাদন কমছে, নিরাপদ পানির সংকট বাড়ছে এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের ঘটনাও বাড়ছে। ফলে অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

স্বাস্থ্য খাতে বিপদ বাড়ছে, কমছে বরাদ্দ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো—জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ক্রমবর্ধমান অভিঘাত। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দের চিত্র উদ্বেগজনক।

সম্প্রতি রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন’ শীর্ষক নীতিসংলাপে উপস্থাপিত গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মোট বাজেটের মধ্যে জলবায়ু-সম্পর্কিত বরাদ্দ ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৯৭ শতাংশে।

একই সময়ে জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশও প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, জলবায়ুজনিত রোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও সেই তুলনায় বাজেট বরাদ্দ বাড়েনি; বরং উল্টো কমেছে।

নতুন স্বাস্থ্য সংকটের মুখে বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনও আশঙ্কা নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান বাস্তবতা।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিটস্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য বাহকবাহিত রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে বাড়ছে ডায়রিয়া, কলেরা এবং পানিবাহিত রোগ। অন্যদিকে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ এবং গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী বছরগুলোতে জলবায়ু উদ্বাস্তু বৃদ্ধির ফলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ আরও বাড়বে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে নারী ও শিশু

নীতিসংলাপে উপস্থাপিত আরেকটি গবেষণায় উপকূলীয় অঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নারীদের প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী প্রায় অর্ধেক নারী জানিয়েছেন, তারা অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, তীব্র মাসিকব্যথা এবং অন্যান্য প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এছাড়া গর্ভপাত, প্রি-একলাম্পসিয়া, প্রসবকালীন জটিলতা এবং প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—অংশগ্রহণকারী ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন যে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধার অভাব তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় সাধারণত ডেঙ্গু, ডায়রিয়া বা পানিবাহিত রোগের বিষয়টি সামনে আসে। অথচ নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর বিকাশের ওপর এর গভীর প্রভাব এখনও যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

প্রকল্পনির্ভর অর্থায়নের ফাঁদ

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জলবায়ু-স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি উন্নয়ন প্রকল্পনির্ভর। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিবর্তে অস্থায়ী কার্যক্রমই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রকল্প শেষ হলে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যক্রমও থেমে যায়। এতে রোগ নজরদারি, মহামারি প্রস্তুতি, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ধারাবাহিকতা হারায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু অভিযোজনের জন্য স্বাস্থ্য খাতে পুনরাবৃত্ত ও স্থায়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

জলবায়ু তহবিলে স্বাস্থ্য খাতের অংশ নগণ্য

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটিএফ) অর্থায়নের চিত্রও স্বাস্থ্য খাতের প্রতি অবহেলার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় অর্থায়ন পাওয়া ৮৭৭টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। মোট অর্থায়নের ১ শতাংশেরও কম স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি স্পষ্ট করে যে দেশের জলবায়ু অর্থায়ন কাঠামোয় স্বাস্থ্য খাত এখনও প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে প্রয়োজন ১৪০ কোটি ডলার

স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) অনুযায়ী, জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। এই অর্থ ব্যয় হবে জলবায়ু-সহনশীল হাসপাতাল নির্মাণ, রোগ নজরদারি ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, জরুরি স্বাস্থ্য প্রস্তুতি, গবেষণা, তথ্যব্যবস্থা উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে। কিন্তু বর্তমান অর্থায়নের ধারা বিবেচনায় এই বিপুল অর্থের সংস্থান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু অবকাঠামো নয়, মানুষকেও সুরক্ষা দিতে হবে

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জলবায়ু খাতে ৫২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এই অর্থের কার্যকর ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। একইসঙ্গে জলবায়ু অভিযোজনকে শুধু বাঁধ নির্মাণ, রাস্তা উন্নয়ন বা অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অভিঘাত শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীর, স্বাস্থ্য ও জীবনের ওপরই পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনকে এখন পরিবেশগত সংকটের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার না দিলে জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যাবে।

বড় বরাদ্দের প্রকৃত সাফল্য কোথায়?

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশংসিত। এবার ৫২ হাজার কোটি টাকার মতো বড় বরাদ্দ সেই অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। এটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।

তবে এই বরাদ্দের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে তার ওপর। যদি উপকূলের নিরাপদ পানি, জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা, রোগ নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই বাজেট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় বড় অঙ্কের বরাদ্দ কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর জলবায়ুর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকেই।