টানা দরপতনের ধাক্কা কাটিয়ে আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে দেশের পুঁজিবাজার। মঙ্গলবার (৯ জুন) সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে বিমা খাতের শক্তিশালী উত্থান এবং বাজারে ইতিবাচক মনোভাবের কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রাম— উভয় শেয়ারবাজারেই মূল্যসূচক বেড়েছে। একইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কমিশনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেওয়া কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ও বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারের ওপর বহাল থাকা সর্বশেষ ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
বিমা খাতের নেতৃত্বে বাজারে উত্থান
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, মঙ্গলবার লেনদেনের শুরু থেকেই প্রায় সব বিমা কোম্পানির শেয়ারে ক্রয়চাপ তৈরি হয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিমা খাতের শেয়ারদরের ঊর্ধ্বগতি আরও জোরালো হয়। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন ও সেবা খাতসহ অন্যান্য খাতেও।
ফলে দিন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ২৪৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১০০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫১টির। শুধু বিমা খাতেই ৫১টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে, যেখানে কমেছে মাত্র ৫টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২টির
এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৩৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫১৯ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক বেড়েছে ৩ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক বেড়েছে ১০ পয়েন্ট।
বাজারের এই উত্থানের ফলে শেষ ১১ কার্যদিবসের মধ্যে ১০ কার্যদিবসেই সূচক ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে থাকল।
বেড়েছে লেনদেনও
মূল্যসূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও ফিরে এসেছে গতি। মঙ্গলবার ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৩১৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বেশি।
সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে এনসিসি ব্যাংকের শেয়ারে, যার পরিমাণ ৪৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় স্থানে ছিল সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স (২৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা) এবং তৃতীয় স্থানে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং (২৭ কোটি ২১ লাখ টাকা)।
এ ছাড়া লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় ছিল আইপিডিসি ফাইন্যান্স, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, বেক্সিমকো ফার্মা এবং রানার অটোমোবাইল।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩ পয়েন্ট বেড়েছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৩৮ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪০টির শেয়ারদর বেড়েছে। যদিও লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমে ২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।
বাজারের নতুন মোড়: ফ্লোর প্রাইস পুরোপুরি প্রত্যাহার
মঙ্গলবারের বাজারে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ইসলামী ব্যাংক ও বেক্সিমকোর শেয়ারের ওপর বহাল থাকা ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত।
বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, বুধবার থেকে এ দুই কোম্পানির শেয়ারে আর কোনো ফ্লোর প্রাইস থাকবে না। এর মাধ্যমে ২০২২ সালের জুলাইয়ে আরোপিত ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অবসান ঘটছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাজারে ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই শেয়ারের সর্বনিম্ন মূল্যসীমা বা ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে নির্ধারিত দামের নিচে কোনো শেয়ার লেনদেন করা সম্ভব ছিল না।
তবে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থা বাজারের স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারী, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং ব্রোকারেজ হাউসগুলো বারবার ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল।
ডিবিএ’র স্বাগত
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) বিএসইসি’র এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী ও বাজারবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে।
সংগঠনটির মতে, ইসলামী ব্যাংক ও বেক্সিমকোর শেয়ারে দীর্ঘদিন ফ্লোর প্রাইস বহাল থাকায় স্বাভাবিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এতে প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ বা ‘প্রাইস ডিসকভারি’ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছিল। পাশাপাশি মার্জিন ঋণগ্রহীতা বিনিয়োগকারীদের নেতিবাচক ইক্যুইটির ঝুঁকি বাড়ছিল।
ডিবিএর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেছেন, নতুন কমিশনের এ সিদ্ধান্ত বাজারকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে বাজারের আস্থা পুনর্গঠনেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা কী
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার ফলে স্বল্পমেয়াদে কিছু শেয়ারের দামে ওঠানামা বাড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারকে বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবে।
তাদের ভাষ্য, কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণই একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্য। ফলে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।
একই সঙ্গে নতুন কমিশনের অধীনে বাজারে সুশাসন, জবাবদিহি ও সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামনে কী
পুঁজিবাজারে প্রায় চার বছর পর ফ্লোর প্রাইসের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। এর পাশাপাশি বিমা খাতের নেতৃত্বে বাজারে ক্রেতাদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং লেনদেন বৃদ্ধির প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে বাজার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে শুরু করেছে।
তবে এই ইতিবাচক ধারা টেকসই করতে হলে শুধু সূচকের উত্থান নয়, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা, দুর্বল কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।