ডলারের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংকের প্রস্তাবের পর দেশটির ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চীনা প্রতিনিধি দলের এক বৈঠকে বিষয় দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক যদি সিআইপিএস প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে চায়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগতভাবে কোনও আপত্তি নেই। একইসঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে পান্ডা বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, ডলারের আধিপত্য নিয়ে বিতর্ক এবং বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আর্থিক সম্পর্ক কতটা গভীর হয় তার ওপর।

কী এই সিআইপিএস?

সিআইপিএস (ক্রস বর্ডার-ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম) হলো চীনের কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত একটি আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, যা ২০১৫ সালে চালু করা হয়। এর প্রধান লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে চীনা মুদ্রা রেনমিনবি বা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো।

বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সুইফট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক দেশ বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামো খুঁজছে। সেই প্রেক্ষাপটে সিআইপিএসকে সুইফটের বিকল্প বা পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সিআইপিএস মূলত আরেকটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যত বেশি লেনদেন চ্যানেল থাকবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য তত বেশি সুযোগ তৈরি হবে। কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক চাইলে নিজস্ব উদ্যোগে এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পারবে।

তার ভাষায়, বর্তমানে সিআইপিএসে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো নিয়ন্ত্রক বাধা বা অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আসেনি। তবে কোনও ব্যাংক বাস্তবে সংযুক্তির উদ্যোগ নিলে তখন প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে।

কেন গুরুত্ব পাচ্ছে সিআইপিএস?

বাংলাদেশের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস দেশ চীন। প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বাংলাদেশ চীন থেকে আমদানি করে। বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

বর্তমানে এই বাণিজ্যের অধিকাংশই ডলারে নিষ্পত্তি হয়। সিআইপিএস ব্যবস্থার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইউয়ানে লেনদেন বাড়ানো গেলে ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপও কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধুমাত্র একটি নতুন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইউয়ানের ব্যবহার কতটা বাড়ছে তার ওপর।

এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরএমবির ব্যবহার যত বাড়বে, সিআইপিএসের গুরুত্বও তত বাড়বে।

তাৎক্ষণিক সুফল কতটা?

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনও সুবিধা নাও পেতে পারে।

কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ভারসাম্যহীন। আমদানি অনেক বেশি হলেও রফতানি সীমিত। ফলে ইউয়ানে লেনদেনের জন্য পর্যাপ্ত মুদ্রা প্রবাহ তৈরি হয় না।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সিআইপিএস দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত বিকল্প হতে পারে। তবে শুধু ইউয়ানভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলেই বড় সুবিধা পাওয়া যাবে না।

তার মতে, চীনা বিনিয়োগ, অবকাঠামো ঋণ, শিল্প খাতে অর্থায়ন এবং যৌথ প্রকল্প বাড়লে ইউয়ানভিত্তিক আর্থিক প্রবাহ তৈরি হবে। তখন আন্তঃসীমান্ত লেনদেন আরও সহজ ও কার্যকর হতে পারে।

তিনি বলেন, অন্যথায় বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত আবার ডলার ব্যবহার করেই অধিকাংশ লেনদেন সম্পন্ন করতে হতে পারে।

আলোচনায় পান্ডা বন্ডও

বৈঠকে পান্ডা বন্ড ইস্যুর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। পান্ডা বন্ড হলো চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা ইউয়ানভিত্তিক ঋণপত্র।

এর মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা সরকার সরাসরি চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।

বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে পান্ডা বন্ড ইস্যু করে, তাহলে চীনের বিশাল বন্ড বাজার থেকে ইউয়ানে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। এতে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস আরও বহুমুখী হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ সুদের ঋণের বিকল্প উৎস পাওয়া যেতে পারে।

তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত মূলত সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ই এ বিষয়ে নেতৃত্ব দেবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক মতামত ও কারিগরি সহায়তা দেবে।

চীনের পুরোনো আগ্রহ, নতুন গতি

বাংলাদেশকে সিআইপিএস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ নতুন নয়। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় বিকল্প নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রবণতা এবং বিভিন্ন দেশের ডলার নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

বিডার সঙ্গে বৈঠক

চীনা এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বৈঠকও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, অর্থায়ন এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি চীনা বিনিয়োগ ও প্রকল্প অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে, তাহলে সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড উভয়ই বাংলাদেশের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে।

বিশ্লেষণ: সুযোগ আছে, তবে প্রস্তুতিও জরুরি

বিশ্লেষকদের মতে, সিআইপিএস এবং পান্ডা বন্ড—দুটিই বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। একদিকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস বহুমুখী হবে।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রিজার্ভ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু এখনও মার্কিন ডলার। ফলে ডলারের বিকল্প কোনো ব্যবস্থায় কার্যকর সুবিধা পেতে হলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণ ও আর্থিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, সিআইপিএস বা পান্ডা বন্ড নিজে কোনো জাদুকরী সমাধান নয়; বরং এগুলো এমন কিছু আর্থিক অবকাঠামো, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হলে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।