অর্থের অভাবে থেমে যাবে না স্বপ্ন

অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রতিবছর হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন না। অনেক পরিবার সন্তানকে বিদেশে পাঠানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় স্বপ্নগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ফলে দেশের একটি বড় মেধাশক্তি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে নেওয়া এ উদ্যোগকে অনেকেই সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

অর্থ নয়, মেধাই হবে মূল যোগ্যতা

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি হচ্ছে দক্ষতা ও জ্ঞান। শুধু সনদ অর্জন নয়, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চায় সরকার।

এ লক্ষ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা ব্যাংকের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। ঋণের সুদের হার তুলনামূলক কম রাখা হবে এবং পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের পর ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার সময় আর্থিক চাপ বহন করতে হবে না। একইসঙ্গে ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানি দূর করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।

নীতিনির্ধারকদের মতে, অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিবর্তে মেধা ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে এ ধরনের ঋণ কর্মসূচি চালু করা গেলে দেশের বহু শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।

বিদেশি ভাষা শেখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় কোনও বিদেশি ভাষায় দক্ষ শিক্ষার্থীরা ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।

এজন্য ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই জাপানি, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফরাসি ও জার্মান ভাষা শিক্ষার বিশেষ কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ভাষা শেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ বাড়াতে পারবেন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এগিয়ে থাকবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক শ্রমবাজারে ভাষাগত দক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ফলে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

‘ব্রেইন ড্রেন’ নয়, ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’

দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় বিতর্ক হলো ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধা পাচার। উন্নত দেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী সেখানেই স্থায়ী হয়ে যান, ফলে দেশ তাদের মেধা থেকে বঞ্চিত হয়।

তবে সরকার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, বিদেশে অর্জিত জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত দক্ষতা একসময় দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। তিনি এটিকে ‘ব্রেইন ড্রেন’ নয়, বরং ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ হিসেবে অভিহিত করেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে জ্ঞান ও দক্ষতার আদান-প্রদানই সবচেয়ে বড় সম্পদ। বিদেশে কর্মরত দক্ষ বাংলাদেশিরা যেমন দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, তেমনি প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমেও দেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারেন।

উচ্চশিক্ষা থেকে দক্ষতা উন্নয়ন

সরকারের নতুন শিক্ষানীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষাকে কর্মমুখী করা। সেই ধারাবাহিকতায় ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন অন্তত একটি পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার ঋণ কর্মসূচিকেও এই বৃহত্তর মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা অর্জন করে দেশে ফিরে আসা শিক্ষার্থীরা শিল্প, প্রযুক্তি, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা ও উদ্যোক্তা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্যও সুবিধা

শুধু বিদেশে উচ্চশিক্ষা নয়, দেশের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্যও শিক্ষাঋণ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যয়বহুল চিকিৎসা শিক্ষায় অর্থসংকটের কারণে যাতে কোনো শিক্ষার্থী পিছিয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের অধীনে অব্যবহৃত অবকাঠামো ব্যবহার করে পাঁচটি আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্র মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থী এবং ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

ডিজিটাল শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণ

উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে প্রযুক্তিকেও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে সরকার। বাজেটে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চগতির ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং স্মার্ট ক্লাসরুম চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।

এতে শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। অনলাইন কোর্স, ভার্চুয়াল ল্যাব এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা আরও আধুনিক ও বৈশ্বিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মানবসম্পদে বিনিয়োগের নতুন বার্তা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ কর্মসূচি কেবল একটি আর্থিক সহায়তা নয়; এটি মানবসম্পদে বিনিয়োগের একটি নীতিগত বার্তা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা যাতে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে, সেই দর্শনের প্রতিফলন রয়েছে এ উদ্যোগে।

তবে এ কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা সহজ হবে, প্রকৃত মেধাবীরা কতটা সুবিধা পাবেন এবং পরিশোধ কাঠামো কতটা শিক্ষাবান্ধব হবে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

তারপরও বলা যায়, অর্থের অভাবে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন হারিয়ে ফেলা হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য এবারের বাজেট একটি নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।