বাজেটের আকার বড়, বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ: এফবিসিসিআই

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
১৩ জুন ২০২৬, ১২:৩০আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ১২:৩০

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারমুখী বলে অভিহিত করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনটির মতে, দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে সরকার অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতার ওপর।

বাজেট পর্যালোচনায় এফবিসিসিআই বলেছে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করেছে। এজন্য সংগঠনটি সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ‘থ্রি-আর’ কৌশল

এবারের বাজেটে সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’—এই তিনটি স্তম্ভভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করেছে। এফবিসিসিআই মনে করে, এই কর্মপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

সর্ববৃহৎ বাজেট, তবে বাস্তবায়নই মূল পরীক্ষা

আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এফবিসিসিআই বলছে, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে অগ্রসর হতে হলে বড় বাজেট প্রয়োজন। তবে এ ধরনের বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

রাজস্ব আদায়ে বিশাল চ্যালেঞ্জ

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

এফবিসিসিআই বলছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন। শিল্প উৎপাদন, আমদানি, ভোগব্যয় এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব করনীতি, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং এনবিআরের সংস্কার জরুরি।

ঘাটতি অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ

প্রস্তাবিত বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতির একটি বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎস এবং বিদেশি ঋণের মাধ্যমে মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এফবিসিসিআইর মতে, ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই সরকারকে তুলনামূলক কম সুদের বিদেশি অর্থায়নের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি।

সুদ পরিশোধে বাড়ছে চাপ

বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু সুদ পরিশোধেই সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

এফবিসিসিআই বলছে, এই বিপুল সুদ ব্যয় ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করবে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিনিয়োগ বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ

সংগঠনটি মনে করে, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—

অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো দ্রুত কার্যকর করা; রফতানি বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান; তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি; ব্যবসার খরচ (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস) কমানো; পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা; ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ; নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা; সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নয়ন; মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠন এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানো।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ইতিবাচক উদ্যোগ

এফবিসিসিআই বলছে, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা, নারী ক্ষমতায়ন এবং কৃষকদের সহায়তা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

সংগঠনটির মতে, সুবিধাভোগীদের সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সেবা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

বাণিজ্য ও এলডিসি উত্তরণে প্রস্তুতির বার্তা

বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (পিটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ) ওপর জোর দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এফবিসিসিআই।

তাদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে এসব উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে উৎসাহ

বাজেটে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবার মানোন্নয়ন এবং সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ব্যবসায়ী সংগঠনটি।

শিল্প ও এসএমই খাতে বড় প্রণোদনা

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ-২০২৬’ ঘোষণা এবং এসএমই খাতের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলকে স্বাগত জানিয়েছে এফবিসিসিআই।

এছাড়া নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরকে স্বাগত

করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনের সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগকে এফবিসিসিআই ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। অনলাইনে আয়কর ও ভ্যাট রিটার্ন দাখিল, স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা ব্যবস্থা, একক উইন্ডো সেবা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ ব্যবসা সহজীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংগঠনটির অভিমত।

করহার কমানোর প্রস্তাব

মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এফবিসিসিআই। তবে সংগঠনটি সর্বোচ্চ করহার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে।

একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করহার আরও কমানোরও সুপারিশ করেছে তারা।

উৎপাদন ব্যয় কমাতে কর-শুল্ক সুবিধা

বাজেটে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর কমানো, কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাস, বিদেশি ঋণের সুদের ওপর কর কমানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসে কর কমানো এবং বিভিন্ন শিল্পখাতে শুল্ক সুবিধা বাড়ানোর মতো উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছে এফবিসিসিআই।

তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

তথ্যপ্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে উৎসাহ

কম্পিউটার, সার্ভার, প্রিন্টার, মনিটরসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর সুবিধা এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে কর ছাড়কে ভবিষ্যতমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে এফবিসিসিআই।

তবে কিছু নির্মাণসামগ্রীর ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি নির্মাণ খাতের ব্যয় বাড়াতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংগঠনটি।

এফবিসিসিআইর মূল্যায়নে, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সামগ্রিকভাবে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও শিল্পবান্ধব। বাজেটে তাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব প্রতিফলিত হয়েছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করে বাজেট বাস্তবায়ন করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংগঠনটির ভাষায়, “বাজেটের আকার বড় হলেও তা অবাস্তব নয়। প্রয়োজন দূরদর্শিতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।”

/জিএম/এম/
সম্পর্কিত
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ‘কমবে’, লাখে কত?
অর্থের অভাবে থেমে যাবে না স্বপ্ন
অসম্ভবকে সম্ভব করার বাজেট, সরকারের সামনে কঠিন পরীক্ষা
সর্বশেষ খবর
টাইমস স্কয়ারে বিশ্বকাপের রঙ, ব্রাজিল-মরক্কো সমর্থকদের উৎসব
টাইমস স্কয়ারে বিশ্বকাপের রঙ, ব্রাজিল-মরক্কো সমর্থকদের উৎসব
২০২২-এর হতাশা পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্নে বিভোর কাতার
২০২২-এর হতাশা পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্নে বিভোর কাতার
একই শব্দে সব অনুভূতি: আমরা কি ‘ভালোবাসা’ শব্দটাকেই হালকা করে ফেলছি?
একই শব্দে সব অনুভূতি: আমরা কি ‘ভালোবাসা’ শব্দটাকেই হালকা করে ফেলছি?
পুলিশ মারবে কেন, থানায় কাঁদলেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান
পুলিশ মারবে কেন, থানায় কাঁদলেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশে এসেই ভিসা নিয়ে যা বললেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার
বাংলাদেশে এসেই ভিসা নিয়ে যা বললেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইটের আঘাত: নেপথ্যে কী
মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইটের আঘাত: নেপথ্যে কী
কী আছে ইরান চুক্তিতে, যা সই করতে প্রস্তুত ট্রাম্প
কী, কেন, কীভাবেকী আছে ইরান চুক্তিতে, যা সই করতে প্রস্তুত ট্রাম্প
যে পাঁচটি তথ্য কখনোই এআই চ্যাটবক্সে ইনপুট দেবেন না
যে পাঁচটি তথ্য কখনোই এআই চ্যাটবক্সে ইনপুট দেবেন না