দেশে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাওয়া ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) বা মুক্তবাণিজ্য এলাকার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই নির্দেশনার ফলে এফটিজেডে কার্যরত ব্যবসায়ীরা ঋণপত্র (এলসি) ছাড়াই চালানভিত্তিক কাঁচামাল ও পণ্য আমদানির সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনঃমোড়কীকরণ (রিপ্যাকেজিং), রিলেবেলিং এবং পুনঃরফতানির সুবিধাও মিলবে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংক এ–সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। এতে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত মুক্তবাণিজ্য এলাকার সুবিধা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও সহজ করা, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, সরবরাহ শৃঙ্খলকে গতিশীল করা এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা।
নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংক এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (ওবিইউ) বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালার আওতায় এফটিজেড–সংশ্লিষ্ট সব লেনদেন পরিচালনা করবে। এ সুবিধা পাবেন উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অনুমোদিত ট্রেডিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী আমদানিকারক এবং এফটিজেডে পরিচালিত লজিস্টিকস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
চালানভিত্তিক আমদানির সুযোগ
নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা চালানভিত্তিক (কনসাইনমেন্ট) পদ্ধতিতে পণ্য আমদানি করতে পারবেন। অর্থাৎ, পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার বা বিক্রি হওয়ার আগ পর্যন্ত এর মালিকানা বিদেশি সরবরাহকারীর কাছেই থাকবে। ফলে এ সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলো এসব পণ্যকে আমদানিকারকের মজুত হিসেবে বিবেচনা করবে না এবং এ–সংক্রান্ত কোনো ঋণঝুঁকিও বহন করতে হবে না।
এতে ব্যবসায়ীদের কার্যকর মূলধনের ওপর চাপ কমবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচামাল ব্যবহার করে পরে মূল্য পরিশোধের সুযোগ তৈরি হবে।
লেনদেনের নিয়মও স্পষ্ট
বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনায় এফটিজেড–সংশ্লিষ্ট লেনদেনের ধরনও স্পষ্ট করেছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরের কোনও প্রতিষ্ঠান এফটিজেড থেকে পণ্য কিনলে সেটি আমদানি হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে, এফটিজেডে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের কাছে সেই বিক্রয় হবে রপ্তানি। এ ক্ষেত্রে যথাযথভাবে রপ্তানি (এক্সপি) ও আমদানি (আইএমপি) সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।
সব ধরনের অর্থ লেনদেন অবাধে রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রায় সম্পন্ন হবে।
কাঁচামাল রাখা যাবে পাঁচ বছর পর্যন্ত
নির্দেশনা অনুযায়ী, চালানভিত্তিক আমদানিকৃত কাঁচামাল ও পণ্য এফটিজেডে সর্বোচ্চ ৪৮ থেকে ৬০ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। অন্যদিকে, বিলম্বিত মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থায় (ডিফার্ড পেমেন্ট), যার মধ্যে বায়ার্স ক্রেডিট ও সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট অন্তর্ভুক্ত, পরিশোধের সময়সীমা সর্বোচ্চ ২৭০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
এডি ব্যাংকগুলো বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো অর্থায়ন সুবিধা দিতে পারবে। পাশাপাশি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটও প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নের সুযোগ পাবে।
ছোট-বড় সব শিল্পই পাবে সুবিধা
নতুন ব্যবস্থার আওতায় এফটিজেডে ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের আমদানি শুল্ক ছাড়াই কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য পণ্য আনতে পারবেন। এসব পণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংযোজন, পুনঃমোড়কীকরণ, রিলেবেলিং এবং পুনঃরপ্তানির সুযোগ থাকবে। তবে দেশের বাজারে সরবরাহ করতে হলে প্রচলিত শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ভেতর থেকেই প্রয়োজনীয় বিদেশি কাঁচামাল সহজে সংগ্রহ করতে পারবে। অন্যদিকে বড় রপ্তানিকারকরাও বিদেশ থেকে কাঁচামাল আসার দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারবেন। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা সহজ হবে।
রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়বে
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এফটিজেড চালু হলে দেশের রফতানিমুখী শিল্পে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সরবরাহ শৃঙ্খল আরও দক্ষ হবে, উৎপাদন ব্যয় ও সময় কমবে এবং পণ্যের লিড টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়বে এবং নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও সহায়ক হবে।
আনোয়ারায় হচ্ছে প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন
সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দেশের প্রথম আধুনিক ফ্রি ট্রেড জোন গড়ে তুলছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, এই মুক্তবাণিজ্য এলাকা চালু হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। একইসঙ্গে বিনিয়োগ, রফতানি এবং শিল্পায়নে নতুন গতি সঞ্চার হবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।