গ্যাসের সংকট, অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে

বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক সময়ে তীব্র গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যখন দেশ শিল্পায়ন, রফতানি বৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু জ্বালানি ঘাটতি এখন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, গ্যাস সংকট এখন আর কেবল জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি।

গত কয়েক বছর ধরেই দেশে গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম ছিল। তবে সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ২১৩ থেকে ২১৫ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট বা ৪৪ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন, আবাসিক খাতসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাত, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যত স্থবির

দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চল—গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভালুকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার অসংখ্য কারখানায় এখন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন হলেও মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। দিনের অনেক সময় গ্যাসের চাপ একেবারেই শূন্যে নেমে আসে।

এর ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। ছোট ও মাঝারি শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ডিজেলচালিত জেনারেটর, এলপিজি কিংবা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামে টি কে গ্রুপের কর্ণফুলী স্টিল মিলস তার একটি উদাহরণ। নিজস্ব ১২ মেগাওয়াট ক্ষমতার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও গ্যাস না থাকায় সেটি চালানো যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, আর বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রফতানিমুখী শিল্প

বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, নিটওয়্যার ও ডাইং শিল্প। এসব শিল্পে গ্যাস শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, উৎপাদন প্রক্রিয়ারও অপরিহার্য উপাদান।

ডাইং ও ফিনিশিং কারখানায় মাঝপথে গ্যাসের চাপ কমে গেলে পুরো ব্যাচের কাপড় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। স্পিনিং মিলগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। শিল্প মালিকদের দাবি, ইতোমধ্যে শতাধিক স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ করেছে অথবা সীমিত আকারে পরিচালিত হচ্ছে।

ফলে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ক্রয়াদেশ বাতিল, অন্য দেশে স্থানান্তর কিংবা মূল্য কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, প্রতিযোগিতা কমছে

গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ডিজেল, এলপিজি বা আমদানিকৃত এলএনজি ব্যবহার করতে হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। ফলে অতিরিক্ত ব্যয় উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। এতে মুনাফা কমে যাচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা দীর্ঘদিন চললে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।

শিল্প থেকে অর্থনীতিগ্যাস সংকটের অভিঘাত বহুমাত্রিক

দেশের শিল্প উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন মত—বর্তমান গ্যাস সংকট শুধু উৎপাদন ব্যাহত করছে না; এটি ধীরে ধীরে শিল্প, রফতানি, কর্মসংস্থান, রাজস্ব এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর গভীর চাপ তৈরি করছে। তাদের মতে, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প এখন শুধু গ্যাস সংকটেই নয়, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সংকটেও ভুগছে। অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছে। এতে প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মূলধন দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে। তিনি জানান, বিভিন্ন সংকটের কারণে ইতোমধ্যে দেশের ১২১টি স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। তাঁর মতে, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বর্তমান গ্যাস সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, জ্বালানি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা এবং সংস্কারের ঘাটতির ফল। অতীতে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হলেও বিকল্প সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়নি। বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

তিনি বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে এখন উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তবে শুধু উদ্যোক্তাদের পক্ষে এই ক্ষতি বহন করা সম্ভব নয়। গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব না হলে সরকার আর্থিক প্রণোদনা, কর-সুবিধা কিংবা অন্যান্য নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকে সহায়তা দিতে পারে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে শক্তিশালী ও টেকসই জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

শুধু পোশাক ও বস্ত্র শিল্প নয়, গ্যাসনির্ভর অন্যান্য শিল্পেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক স্টিল মিল কার্যত উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। এই অবস্থা দীর্ঘ হলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস সংকট এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস এনে কিছু কারখানা উৎপাদন চালিয়ে নিলেও এখন সেই সুযোগও নেই। ফলে ডায়িং, ফিনিশিং ও আয়রনিং কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময়মতো রফতানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রয়াদেশ স্থগিত, বাতিল কিংবা মূল্য কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিকল্প সক্ষমতা নেই। ফলে একটি এলএনজি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ হলেই শিল্প খাতসহ পুরো অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে।

অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ার ফলেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট এড়াতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, গ্যাস সংকট এখন শিল্প খাতের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন সীমিত করা হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, রফতানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মঘণ্টা, শ্রমিকদের আয় ও কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়ছে

তিনি আরও বলেন, উদ্বেগের বিষয় হলো—শিল্প উদ্যোক্তারা গ্যাসের উচ্চ মূল্য পরিশোধ করেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাচ্ছেন না। এতে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; বরং এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহের জন্য স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নীতি প্রণয়ন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অপচয় ও অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত এলএনজিনির্ভর পরিকল্পনার কারণে দেশের জ্বালানি খাত আজ সংকটে পড়েছে। তাঁর মতে, কোনও অবস্থাতেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে এলএনজি আমদানিনির্ভর হওয়া উচিত নয়। বরং ভোলা ও বরিশালের গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা, বাপেক্সের নতুন কূপ খননের কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্তমানে গ্যাস বিতরণকারী ছয়টি কোম্পানির কাছে নতুন শিল্প সংযোগের ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ জমা দিলেও এখনও গ্যাস সংযোগ পায়নি।

সরকার জ্বালানি সংকট কাটার আগ পর্যন্ত নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ এবং পুরোনো শিল্পে লোড বৃদ্ধি স্থগিত রেখেছে। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে।

মেঘনা গ্রুপ কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি বড় শিল্পকারখানা নির্মাণ করেও উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। শুধু ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। সিটি গ্রুপের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও গ্যাসের অভাবে আটকে রয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পাইপলাইন নির্মাণ করেও তারা সংযোগ পায়নি। স্কয়ার গ্রুপ নতুন বস্ত্র কারখানা চালু করতে পারছে না। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও ভোলায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার শিল্পপার্ক বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, একদিকে সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে শিল্পে জ্বালানির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না—এটি বিনিয়োগকারীদের কাছে পরস্পরবিরোধী বার্তা দিচ্ছে।

কর্মসংস্থানে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের শিল্প খাত লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস। উৎপাদন কমে গেলে প্রথম ধাক্কা লাগে শ্রমবাজারে অনেক কারখানায় শ্রমিকদের অলস বসিয়ে রাখা হচ্ছে। কোথাও কম সময় কাজ করানো হচ্ছে, আবার কোথাও বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিও বাড়বে।

একই সঙ্গে নতুন শিল্প চালু না হওয়ায় সম্ভাব্য হাজার হাজার কর্মসংস্থানও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্কয়ার গ্রুপ জানিয়েছে, পর্যাপ্ত গ্যাস পেলে আগামী পাঁচ বছরে তাদের নতুন প্রকল্পে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। প্রাণ-আরএফএলের পরিকল্পিত শিল্পপার্কে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের।

ব্যাংক খাতেও বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণের মাধ্যমে পরিচালিত। উৎপাদন কমে গেলে বিক্রি ও নগদ প্রবাহ কমে যায়। ফলে ঋণের কিস্তি পরিশোধে সমস্যা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন ঋণ বিতরণও বাধাগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা আর্থিক খাতেও ছড়িয়ে পড়বে।

মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই এসে পড়ে। ডিজেল, এলপিজি বা ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালালে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করবে। এতে নির্মাণসামগ্রী, পোশাক, ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যের দাম বাড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি কমানোর যে প্রচেষ্টা চলছে, গ্যাস সংকট তা দুর্বল করে দিতে পারে।

অর্থায়নের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হলো জ্বালানি সংকট

বর্তমানে বেসরকারি খাত একসঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে—অর্থায়নের সংকট এবং জ্বালানি সংকট। বাংলাদেশ বিজনেস ইনডেক্স ২০২৪-২৫ অনুযায়ী, ব্যবসায়িক পরিবেশের ১১টি সূচকের মধ্যে অর্থায়নের সুযোগ সবচেয়ে দুর্বল। একইসঙ্গে গ্যাস সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে শিল্পকে আরও চাপে ফেলছে।

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগের গতি ফিরে আসবে না।

উচ্চমূল্যের এলএনজি কতটা কার্যকর?

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় আইএসও ট্যাংকারের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব এসেছে। তবে এতে শিল্পে গ্যাসের মূল্য বর্তমানের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, এত উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে এটি জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিত সময়ের সমাধান হতে পারে, কিন্তু টেকসই সমাধান নয়।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে গতি আনতে হবে। ভোলা ও বরিশালের গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হবে। এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং শিল্পাঞ্চলের গ্যাস অবকাঠামো আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো শিল্প, রফতানি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ। এই তিনটি খাতই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, উৎপাদন তত কমবে, বিনিয়োগ স্থবির হবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে, রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের সাময়িক যান্ত্রিক ত্রুটি বর্তমান সংকটকে তীব্র করেছে। তবে এর পেছনে দীর্ঘদিনের দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ধীরগতি, আমদানিনির্ভরতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি পরিকল্পনার দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারলে শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি কিংবা এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য—কোনোটিই টেকসইভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।