অর্থ বছরের শুরুতেই  পোশাক রফতানি কমেছে ১.৯২ শতাংশ

নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭-এর প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য কমেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে দেশের পোশাক রফতানি হয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৫ সালের একই মাসের ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কম।

তবে এই সামান্য নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছে না তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটির মতে, গত বছরের জুলাই ছিল বাংলাদেশের পোশাক রফতানির ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী মাস। সেই সময় একক মাসে ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের রফতানি এবং ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। ফলে সেই অস্বাভাবিক উচ্চ ভিত্তির সঙ্গে তুলনা করলে এবার সামান্য পতন স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত।

বিজিএমইএর ভাষ্য, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জুলাইয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের রফতানি দেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতারই প্রমাণ।

উচ্চ ভিত্তির কারণে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন অর্থনীতিতে একটি প্রচলিত ধারণা হলো ‘বেস ইফেক্ট’ বা উচ্চ ভিত্তির প্রভাব। কোনও একটি বছরে যদি অস্বাভাবিকভাবে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলে পরবর্তী বছরে সেই একই মাত্রার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজিএমইএ বলছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে পোশাক রফতানি ছিল দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা মাস। ফলে সেই রেকর্ড পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করে চলতি বছরের ফলাফল মূল্যায়ন করলে প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না। বরং বিদ্যমান সংকটের মধ্যেও রপ্তানির উচ্চ অবস্থান ধরে রাখা শিল্পের জন্য ইতিবাচক দিক।

গ্যাস সংকট উৎপাদনে বড় বাধা

শিল্পমালিকরা বলছেন, বর্তমানে দেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— গ্যাসের তীব্র সংকট। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় দিনের দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা যাচ্ছে না।

গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানাকে উৎপাদনের সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও শিফট কমাতে হচ্ছে, আবার কিছু কারখানায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উৎপাদন স্থগিত রাখার ঘটনাও ঘটছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে উঠছে।

এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার ওঠানামাও বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

ওভেন পোশাকের রফতানিতে বেশি ধাক্কা

ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই মাসে ওভেন পোশাক রফতানিতে তুলনামূলক বেশি পতন হয়েছে। ওভেন পোশাক রফতানি কমেছে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে নিট পোশাক রফতানি কমেছে মাত্র ০ দশমিক ৯০ শতাংশ।

অর্থাৎ নিটওয়্যার খাত তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে টি-শার্ট, সোয়েটার, নিট টপসসহ বিভিন্ন নিটজাত পণ্যের চাহিদা তুলনামূলক ভালো থাকায় এই খাতে পতন সীমিত ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউডি তথ্যেও মিলছে একই চিত্র

রফতানির পাশাপাশি বিজিএমইএ’র ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) তথ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সম্পাদিত ইউডি’র পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। ইউডি মূলত রপ্তানির প্রস্তুতি ও কাঁচামাল ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ফলে এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, রফতানি কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা এখনও বিদ্যমান।

কাঠামোগত সমস্যার সমাধান জরুরি

বিজিএমইএর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু বাজার পরিস্থিতির উন্নতি যথেষ্ট নয়। শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সময়োপযোগী নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংগঠনটি বলছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে রফতানি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আরও কঠিন

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শুধু অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন শুধু কম দামের পণ্য নয়, দ্রুত সরবরাহ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, টেকসই কারখানা এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করা এখন শুধু উৎপাদনের প্রশ্ন নয়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকারও পূর্বশর্ত।

আশাবাদী বিজিএমইএ

সব ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যেও বিজিএমইএ মনে করছে, নতুন অর্থবছরের শুরু হতাশাজনক নয়। বরং ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ রপ্তানি ভিত্তির পরও ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি দেশের পোশাক শিল্পের স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ।

সংগঠনটি জানিয়েছে, শিল্পের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে তারা। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেছে বিজিএমইএ।