পোশাক রফতানিতে বিপর্যয়, ‘বাংলাদেশ মানেই সস্তা’ ধারণাই কি কারণ

গোলাম মওলা
২৮ জুলাই ২০২৬, ২১:১৬আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ২২:০০

বিশ্ব পোশাক শিল্প আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক রফতানি ৪.৪৬ শতাংশ বেড়ে ৫৭৪.৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু এই সম্প্রসারিত বাজারে বাংলাদেশের অর্জন তুলনামূলক হতাশাজনক। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে মাত্র ০.৮৯ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি ১০.৫৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১৬.৮৮ শতাংশ। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ববাজার যখন বাড়ছে, তখন কেন সেই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ?

শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর উত্তর শুধু গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার বা উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর একটি কাঠামোগত সমস্যা। আন্তর্জাতিক বাজারে এখনও বাংলাদেশকে প্রধানত ‘কম দামে পোশাক উৎপাদনের দেশ’ হিসেবেই দেখা হয়। ফলে উচ্চমূল্যের পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন কিংবা মূল্য সংযোজনের পরিবর্তে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় কম দামের অর্ডার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণা পরিবর্তন না হলে বিশ্ববাজারের নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ মানেই সস্তা’—এই ধারণা ভাঙতে হবে

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ মূলত কম মূল্য সংযোজনের বা স্বল্পমূল্যের পোশাক উৎপাদন করে এসেছে। এখন শিল্প সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে উচ্চমূল্যের ও উদ্ভাবনী পণ্যের দিকে যেতে চাইলেও নানা বাধার মুখে পড়ছে।’’ তার ভাষায়, এই সীমাবদ্ধতার কিছু কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ হলেও একটি বড় কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মানসিকতা।

তিনি বলেন, ‘‘অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতার মনে এখনও একটি ধারণা কাজ করে—বাংলাদেশ মানেই সস্তায় উৎপাদন। তারা অন্য কোনও দেশকে একটি পণ্যের জন্য যে মূল্য দিতে রাজি, বাংলাদেশকে একই পণ্য আরও কম দামে সরবরাহ করার চাপ দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ভালো মানের বা উচ্চমূল্যের পণ্যের পরিবর্তে কম দামের অর্ডারই তারা বাংলাদেশে দিতে আগ্রহী।’’ তার মতে, এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। কারণ শুধু কম দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ ভবিষ্যতে আর থাকবে না

দামের প্রতিযোগিতা থেকে সক্ষমতার প্রতিযোগিতায়

বিশ্বের পোশাকশিল্প দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এক সময় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রধান লক্ষ্য ছিল উৎপাদন খরচ কমানো। এখন তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দ্রুত সরবরাহ, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা।

অর্থাৎ, প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু এখন শুধু কম দাম নয়, বরং গতি, প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নির্ভরযোগ্যতা।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চীন, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলো উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রযুক্তি বিনিয়োগ করেছে। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশ এখনও অনেক ক্ষেত্রে কম দামের অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এই রূপান্তরে পিছিয়ে রয়েছে।

অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতা শিল্পকে দুর্বল করছে

মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বাজারে এমন কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা রয়েছে যারা বাস্তবসম্মত উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন মূল্য প্রস্তাব করে। বাংলাদেশের অনেক কারখানার কাজের প্রয়োজনীয়তা ও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার সুযোগ নিয়ে তারা অস্বাভাবিক কম দামে অর্ডার আদায়ের চেষ্টা করে।

তিনি বলেন, ‘‘কখনও কখনও এমন মূল্য প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা বাস্তবে উৎপাদন করাই সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে একটি শীতকালীন জ্যাকেটের জন্য মাত্র পাঁচ ডলার মূল্য প্রস্তাব করা হয়। বাস্তবে ওই দামে মানসম্মত একটি জ্যাকেট উৎপাদন করা সম্ভব নয়।’’ তার মতে, এই ধরনের মূল্য প্রতিযোগিতা শুধু কারখানার মুনাফা কমায় না, বরং পুরো শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দেয়।

ব্র্যান্ডগুলোরও বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্বব্যাপী আল্ট্রা-ফাস্ট ফ্যাশনের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশে নতুন পরিবেশ আইন, বাধ্যতামূলক ট্রেসেবিলিটি এবং টেকসই উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, এই পরিবর্তনের বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোরও তাদের ক্রয়নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

তিনি বলেন, ‘‘ভবিষ্যতের পোশাকশিল্প শুধু সস্তা পণ্য দিয়ে টিকবে না। উন্নত মানের, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে যেতে হবে। আর সেই রূপান্তরে শুধু কারখানাগুলোর ওপর দায় চাপিয়ে দিলে হবে না— আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অংশীদার হতে হবে।

বাংলাদেশেরও রয়েছে নিজস্ব সীমাবদ্ধতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ক্রেতাদের মানসিকতার সমালোচনা করলেই হবে না। বাংলাদেশের নিজেদেরও অনেক কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকঋণ সংকট, লজিস্টিকস ব্যয়, বন্দরজট, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সীমিত সক্ষমতা শিল্পের প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানা ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, তথ্যভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারেনি।

ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সেলাই কারখানার সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। সুতা, কাপড়, ডাইং, ফিনিশিং, রাসায়নিক এবং আনুষঙ্গিক শিল্পে আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

এতে বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমবে, উৎপাদনের সময় কমবে এবং দ্রুত অর্ডার সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনও সংকট দেখা দিলেও বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়

বর্তমান ব্যবসায়িক মডেলে অধিকাংশ অর্ডার আসে স্বল্পমেয়াদি দরপত্রের মাধ্যমে। এতে প্রতিবারই মূল্য কমানোর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মডেল থেকে বেরিয়ে এসে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, স্থানীয় প্রস্তুতকারক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তি, গবেষণা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে।

এতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প শুধু বড় পরিমাণে উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেই নয়, বরং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

ভবিষ্যতের প্রশ্ন বদলে গেছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের মূল প্রশ্ন আর এটি নয়—‘‘বাংলাদেশ কি আরও কম দামে পোশাক তৈরি করতে পারবে?’’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘‘বাংলাদেশকে কীভাবে আরও দ্রুত, আরও স্বচ্ছ, আরও প্রযুক্তিনির্ভর এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী বৈশ্বিক উৎপাদন অংশীদারে পরিণত করা যায়?’’

এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন হতে পারে। কারণ বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এখন আর শুধু সর্বনিম্ন মূল্যের ওপর নির্ভর করছে না; বরং গতি, স্থিতিস্থাপকতা, টেকসই উৎপাদন, ডিজিটাল স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক আস্থাকেই নতুন প্রতিযোগিতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।

বাংলাদেশ যদি এই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তাহলে শুধু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক হিসেবেই নয়, বরং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, উদ্ভাবন ও টেকসই শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থান তৈরি করতে পারবে। আর তা না হলে বিশ্ববাজার সম্প্রসারিত হলেও সেই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর হাতেই চলে যাবে।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
চলতি অর্থবছরে রফতানির লক্ষ্য ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার
গ্যাস সংকট: বন্ধ হচ্ছে কারখানা, ঝুঁকিতে রফতানি-কর্মসংস্থান
রফতানিতে বড় লক্ষ্যমাত্রা সরকারের
সর্বশেষ খবর
গ্রাহকের লকার থেকে ২০৭ তোলা স্বর্ণ চুরির অভিযোগে গ্রেফতার বাবা ও দুই ছেলে
গ্রাহকের লকার থেকে ২০৭ তোলা স্বর্ণ চুরির অভিযোগে গ্রেফতার বাবা ও দুই ছেলে
গ্যাসের সংকট, অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে
গ্যাসের সংকট, অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
ফের মানচিনিতে ভরসা ইতালির
ফের মানচিনিতে ভরসা ইতালির
সর্বাধিক পঠিত
মেসির ৩ ছেলে, কে কোন পায়ে ও কোন পজিশনে খেলে
মেসির ৩ ছেলে, কে কোন পায়ে ও কোন পজিশনে খেলে
আমিরাতের ভিসা বাতিল নিয়ে যা বলছে দূতাবাস 
আমিরাতের ভিসা বাতিল নিয়ে যা বলছে দূতাবাস 
ইরানের ‘মশা নৌবহরের’ প্রশংসায় পুতিন, বললেন যুদ্ধে বেশ কার্যকর
ইরানের ‘মশা নৌবহরের’ প্রশংসায় পুতিন, বললেন যুদ্ধে বেশ কার্যকর
মেসির ৩ ছেলের মধ্যে কে সবচেয়ে ভালো ফুটবলার হতে পারে?
মেসির ৩ ছেলের মধ্যে কে সবচেয়ে ভালো ফুটবলার হতে পারে?
যুবদলের কমিটি দেওয়ার পরদিনই ১৬ নেতার পদত্যাগ
যুবদলের কমিটি দেওয়ার পরদিনই ১৬ নেতার পদত্যাগ