ব্যাংক ঋণের এক-তৃতীয়াংশই চুরি হয়ে গেছে: গভর্নর

দেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণ জালিয়াতির কারণে ব্যাংক ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ কার্যত চুরি হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, যেসব অর্থকে বর্তমানে খেলাপি ঋণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তার বড় অংশই আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর ফলে দেশের প্রায় দুই কোটি আমানতকারী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর জনগণের আস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।

বুধবার (৬ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাচ-বাংলা ব্যাংক আয়োজিত ‘বাংলা কিউআর’ বিষয়ক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গভর্নর বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল তদারকি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত গভীর সংকটে পড়েছে। তাঁর ভাষায়, ব্যাংকিং খাতের এক-তৃতীয়াংশ টাকা চুরি হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা খেলাপি ঋণ বলছি, প্রকৃতপক্ষে সেটি চুরি হওয়া অর্থ। তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য এ হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এত উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকেই দুর্বল করেনি, বরং পুরো অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, অতীতে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ হওয়ার কারণে দেশের প্রায় দুই কোটি আমানতকারী নানা ধরনের অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। তাই আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

খেলাপি ঋণ কমাতে ১৮ মাসের কর্মপরিকল্পনা

ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, প্রথম ছয় মাসে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ঋণগ্রহীতাদের ‘বুলেট পেমেন্ট’-এর মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তি করে ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

এরপরের এক বছরে খেলাপি ঋণ আদায় এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করতে নতুন আইনি কাঠামো চালু করা হবে। এ লক্ষ্যে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন এবং অর্থ ঋণ আদালত আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। আগামী সংসদ অধিবেশনেই আইন দুটি পাস হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গভর্নরের মতে, নতুন আইন কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

সেপ্টেম্বরে আসছে ৬০ হাজার কোটি টাকার নতুন ঋণ প্যাকেজ

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়াতে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ঋণ প্যাকেজ চালু করার পরিকল্পনার কথাও জানান গভর্নর। তার আশা, এই তহবিল উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

প্রতিটি উপজেলা থেকে উদ্যোক্তা তৈরি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক

তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলেও জানান মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে ২৮ বছরের নিচের ১০ জন তরুণকে নির্বাচন করে সারা দেশে মোট ৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তোলা হবে। নির্বাচিত তরুণদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তারা নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব

গভর্নর বলেন, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে শুধু ব্যাংকিং খাতের সংস্কারই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারাও বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার, স্বচ্ছ ব্যাংকিং ব্যবস্থা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর আইনি সংস্কার একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের আর্থিক খাতে জনগণের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।