দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন দ্রুত বাড়ছে। এক বছরের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে ৪৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। একই সময়ে ক্রেডিট কার্ডের ঋণস্থিতিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ও নগদ টাকার বিকল্প হিসেবে কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় না বাড়া এবং মানুষের ঋণনির্ভরতা— এই তিনটি বিষয়ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। গত বছরের একই মাসে এই লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৩ দশমিক ২৪ শতাংশ।
জুনের মোট ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৯১ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে কেনাকাটায়। নগদ টাকা উত্তোলনে ব্যবহার হয়েছে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ এবং অর্থ স্থানান্তরে ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
তবে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনের বড় অংশই কেনাকাটায় হচ্ছে— বাংলাদেশ ব্যাংকের শ্রেণিকরণ থেকে এমন ধারণা পাওয়া গেলেও বাস্তবে এর পুরোটা কেনাকাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ক্রেডিট কার্ড থেকে মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানে টাকা স্থানান্তরের মতো কিছু লেনদেনও ই-কমার্স বা কেনাকাটার লেনদেন হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হচ্ছে। ফলে কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত কেনাকাটার পরিমাণ কিছুটা কমও হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো বাড়ছে
ব্যাংকাররা বলছেন, দেশে ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো শক্তিশালী হওয়ার কারণে সামগ্রিকভাবে কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। কিউআর কোড, পিওএস মেশিন, এমএফএস এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্যে আন্তঃলেনদেনের সুযোগ বাড়ায় মানুষ নগদ টাকার পরিবর্তে কার্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
সিটি ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান মো. অরূপ হায়দার বলেন, “দেশের ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বাড়ছে। তবে বিষয়টিকে শুধু কেনাকাটা বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এমএফএসে টাকা যোগ করার কিছু লেনদেনও ই-কমার্স লেনদেন হিসেবে শ্রেণীভুক্ত হয়। পরে সেই অর্থ কেনাকাটায় ব্যবহার হচ্ছে নাকি নগদে তোলা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।”
তিনি বলেন, “গত বছর সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ হয়েছে। একই সঙ্গে এমএফএস লেনদেনও প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। নির্বাচনের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হওয়া, কিউআরভিত্তিক লেনদেনের বিস্তার এবং ছোট অঙ্কের লেনদেন বাড়ার প্রভাবও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে।”
মূল্যস্ফীতির চাপেও বাড়ছে কার্ডের ব্যবহার
তবে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধির পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই কাজ করছে না। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানে চাপ এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতার কারণে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করে দৈনন্দিন খরচ চালাতে হচ্ছে। ফলে ক্রেডিট কার্ড এখন অনেকের কাছে শুধু কেনাকাটার সুবিধা নয়, বরং জরুরি সময়ে ঋণ পাওয়ার একটি সহজ মাধ্যম হয়ে উঠছে।
ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে সাধারণত আলাদা জামানত দিতে হয় না। ফলে ব্যাংকঋণের তুলনায় অনেকের কাছে এটি দ্রুত অর্থ পাওয়ার সহজ উপায়। এ কারণে এক কার্ডের ঋণ পরিশোধে আরেক কার্ড ব্যবহার কিংবা ক্রেডিট কার্ড থেকে এমএফএসে অর্থ নিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধের প্রবণতাও তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও ঋণনির্ভরতার এ প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মোট ঋণস্থিতি ছিল প্রায় ৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রায় তিন বছরে ক্রেডিট কার্ডের ঋণস্থিতি বেড়েছে প্রায় দেড় গুণ।
এক কার্ডের ঋণ শোধে আরেক কার্ড
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তৌফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও এই প্রবণতার একটি উদাহরণ। আগে তার একটি ক্রেডিট কার্ড ছিল। সম্প্রতি তিনি আরেকটি কার্ড নিয়েছেন। নতুন কার্ড পাওয়ার পর সেখান থেকে অর্থ তুলে পুরোনো ধার পরিশোধ করেছেন।
তৌফিকুল বলেন, “তার অনেক টাকা ঋণ হয়ে গিয়েছিল। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে জামানত দেখাতে হয়। কিন্তু ক্রেডিট কার্ডে জামানত লাগে না। তাই নতুন কার্ড নিয়ে সেখান থেকে এমএফএসের মাধ্যমে টাকা নিয়ে পুরোনো ধার পরিশোধ করেছেন। এখন তিনি মাসিক ন্যূনতম পাওনা পরিশোধ করে কার্ডটি সচল রাখবেন।”
এই ধরনের ব্যবহার ক্রেডিট কার্ডের প্রবৃদ্ধির একটি ভিন্ন দিক সামনে আনছে। কার্ডের লেনদেন বাড়া একদিকে ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের ইঙ্গিত দিলেও অন্যদিকে এটি যদি মানুষের আয় বৃদ্ধির পরিবর্তে ঋণনির্ভর খরচ বাড়ার ফল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তা ব্যাংকিং খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাজারে এগিয়ে সিটি ব্যাংক
দেশের ক্রেডিট কার্ড বাজারে সবচেয়ে বড় অবস্থান সিটি ব্যাংকের। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কার্ডসেবা আমেরিকান এক্সপ্রেসের বাংলাদেশে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে কার্ড ব্যবসায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পাশাপাশি ভিসা ও মাস্টারকার্ডসহ অন্যান্য কার্ডসেবাও রয়েছে তাদের।
বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করেছে সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৭ লাখ ২৩ হাজার ৮৩০।
অপরদিকে ব্র্যাক ব্যাংকও ক্রেডিট কার্ডের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, “অর্থনীতির আকার ও জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের বাজার এখনও বেশ ছোট। উচ্চ সুদহারসহ নানা কারণে এতদিন এই বাজারের সম্প্রসারণ হয়নি। পাশাপাশি দেশে নগদবিহীন লেনদেনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও ছিল।”
তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এসব সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কমেছে। ফলে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধিতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রভাব রয়েছে।
তবে একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং বেতন-ভাতা না বাড়ার প্রভাবেও মানুষ ক্রেডিট কার্ডের ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ক্রেডিট কার্ডের ঋণস্থিতি বেড়ে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। এর প্রভাবে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণও বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান অবশ্য ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধিকে দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার অগ্রগতির একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, “দেশে কিউআর কোডসহ সার্বিক ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়েছে। মার্চেন্ট পর্যায়ে পিওএস মেশিনের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে এমএফএস ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্যে আন্তঃলেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে মানুষ এখন নগদ টাকার পরিবর্তে কার্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। এটি দেশের নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যকে আরও গতিশীল করছে।”
প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে
সব মিলিয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধির পেছনে দুটি বিপরীত বাস্তবতা পাশাপাশি কাজ করছে। একদিকে ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো সম্প্রসারণ, কিউআর ও পিওএসের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং এমএফএস-বাণিজ্যিক ব্যাংকের আন্তঃসংযোগ মানুষকে কার্ড ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় না বাড়া, কর্মসংস্থানে চাপ এবং বাড়তি ঋণের প্রয়োজনও অনেক মানুষকে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে বাধ্য করছে।
ফলে এক বছরে ক্রেডিট কার্ড লেনদেন ৪৩ শতাংশের বেশি বাড়াকে শুধু ডিজিটাল অর্থনীতির সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে মানুষের ঋণনির্ভরতা কতটা বাড়ছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ডের ঋণস্থিতি যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের চাপ তৈরি হচ্ছে কিনা, ব্যাংকগুলোকে এখন থেকেই তা নজরদারিতে রাখতে হবে।
কারণ ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও আয় না বাড়িয়ে ঋণ নিয়ে ভোগব্যয় বাড়তে থাকলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে স্বস্তির নয়, বরং নতুন আর্থিক ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।