আমদানি কার্যক্রমে ঋণপত্র (এলসি) খোলা, বিদেশে অর্থ পাঠানো, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলসহ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের বিভিন্ন নিয়ম এখন থেকে একটি প্রজ্ঞাপনের আওতায় পাওয়া যাবে। বিভিন্ন সময়ে জারি করা নির্দেশনাগুলো একত্র করে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) নতুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এ উদ্যোগে আমদানিকারক ও ব্যাংকারদের জন্য আমদানি-সংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণ করা তুলনামূলক সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন প্রজ্ঞাপনে মূলত বিদ্যমান নির্দেশনাগুলোকে এক জায়গায় এনে হালনাগাদ করা হয়েছে। অর্থাৎ এতে নতুন করে বড় কোনো সুবিধা বা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি।
নতুন প্রজ্ঞাপনের ফলে আমদানি-সংক্রান্ত বিভিন্ন নির্দেশনা খুঁজতে ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের আর আলাদা আলাদা প্রজ্ঞাপন বা সার্কুলার দেখতে হবে না। একটি নীতিমালার মধ্যেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া যাবে।
এক প্রজ্ঞাপনেই যেসব নিয়ম
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন প্রজ্ঞাপনে আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলার পদ্ধতি, অনলাইনে আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার নিয়ম এবং বিদেশি সরবরাহকারীকে অগ্রিম অর্থ পাঠানোর বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া আমদানিকৃত পণ্য দেশে এসেছে—এর প্রমাণ হিসেবে বিল অব এন্ট্রি জমা দেওয়ার নিয়ম, বিদেশি সরবরাহকারী বা ক্রেতার কাছ থেকে ঋণ নেওয়া এবং আমদানির বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিধানও এতে রাখা হয়েছে।
রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির নিয়মও নতুন প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল পদ্ধতিতে আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই এবং প্রচলিত ব্যাংকঋণের বাইরে বিকল্প উপায়ে বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগের বিষয়টিও এতে রয়েছে।
রফতানি আয় ব্যবহার করে আমদানি ব্যয় পরিশোধের নিয়মও নতুন প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের আমদানি কার্যক্রমের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া সোনা, রুপা, অলংকার এবং বিদেশি মুদ্রার নোট আমদানির ক্ষেত্রেও কী ধরনের নিয়ম অনুসরণ করতে হবে, তা নতুন প্রজ্ঞাপনে তুলে ধরা হয়েছে।
আগের নির্দেশনা আর আলাদাভাবে নয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখন থেকে আমদানি-সংক্রান্ত আগের নির্দেশনাগুলো আলাদাভাবে কার্যকর থাকবে না। নতুন প্রজ্ঞাপনে একীভূত করা বিধানগুলোই অনুসরণ করতে হবে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংককে আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য জানানো বা প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রে আগে যে নিয়ম চালু ছিল, তা বহাল থাকবে।
বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর আওতায় জারি করা নতুন এ নির্দেশনাগুলো এক বছর কার্যকর থাকবে। এ সময়ের মধ্যে আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা জারি হলে সেটিও সংশ্লিষ্ট বিধানের সঙ্গে সমন্বয় করে অনুসরণ করতে হবে।
ব্যবসায়ীদের জন্য কী সুবিধা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি-সংক্রান্ত বিধিবিধান এক জায়গায় আনার ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে সময় ও জটিলতা কমে আসা। এত দিন আমদানিকারকদের এলসি খোলা, অর্থ পাঠানো, কাগজপত্র দাখিল কিংবা আমদানি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে জারি করা একাধিক নির্দেশনা খুঁজে দেখতে হতো।
একইভাবে ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও কোনো নির্দিষ্ট আমদানি লেনদেনের ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন একাধিক সার্কুলার মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতো। নতুন প্রজ্ঞাপনে এসব নির্দেশনা একত্রিত হওয়ায় ব্যাংক ও আমদানিকারক উভয়ের কাজ সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমে কাগজপত্র যাচাই এবং বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়নের বিধান যুক্ত হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। এর ফলে আমদানি প্রক্রিয়ায় সময় কমানো এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাস্তবায়নেই মূল চ্যালেঞ্জ
তবে শুধু সব নিয়ম এক জায়গায় আনলেই আমদানি প্রক্রিয়ার জটিলতা পুরোপুরি দূর হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের নতুন নিয়ম সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
বিশেষ করে ডিজিটাল কাগজপত্র যাচাই ও বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগ বাস্তবে কতটা দ্রুত এবং সহজে পাওয়া যাবে, তার ওপর নতুন উদ্যোগের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, আমদানি-সংক্রান্ত নির্দেশনা একীভূত করার পাশাপাশি ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো, দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগ দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ ও গতিশীল করতে ভূমিকা রাখবে।