ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে ৫৭ শতাংশ

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মুনাফা, আমানত, ঋণ ও পরিচালন দক্ষতাসহ প্রায় সব সূচকেই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির সব সহযোগী প্রতিষ্ঠানসহ সমন্বিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে এই মুনাফার পরিমাণ ছিল ৯০৬ কোটি টাকা।

একই সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের একক নিট মুনাফা বেড়েছে আরও বেশি হারে। আগের বছরের ৬২০ কোটি টাকা থেকে ৬৭ শতাংশ বেড়ে চলতি বছরের প্রথমার্ধে তা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকায়।

ব্যাংকটির ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত ভার্চ্যুয়াল আয়-সংক্রান্ত সভায় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের আর্থিক ফলাফল ও ব্যবসায়িক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, গবেষণা বিশ্লেষক, তহবিল ব্যবস্থাপক ও পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা অংশ নেন।

আমানত বেড়েছে ২৫ শতাংশ

সামষ্টিক অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাজারের গড় প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে ব্র্যাক ব্যাংক। জুন শেষে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংকটির গ্রাহক আমানত বেড়েছে ২৫ শতাংশ। একই সময়ে ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে ১৮ শতাংশ।

এ বছরের ৩০ জুন শেষে ব্যাংকটির গ্রাহক আমানতের পরিমাণ ৯৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণও ছাড়িয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনাধীন মোট তহবিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।

করপোরেট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং খুচরা ব্যাংকিং—তিন ক্ষেত্রেই ঋণ ও ব্যবসার পরিমাণ বাড়িয়েছে ব্যাংকটি। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের হারও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

কমেছে পরিচালন ব্যয়

ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালন দক্ষতারও উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে যেখানে আয়-ব্যয়ের অনুপাত ছিল ৪৮ শতাংশ, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা কমে ৪২ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও ব্যাংকটি অগ্রগতি করেছে।

ব্যাংকটির ভাষ্য, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সম্প্রসারণের ফলে পরিচালন দক্ষতায় এই উন্নতি হয়েছে।

শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্র্যাক ব্যাংকের সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বেড়ে চলতি বছরের জুন শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ৭ পয়সায়।

এদিকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ৪৪ টাকা ৮৪ পয়সা থাকা সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) চলতি বছরের ৩০ জুনে বেড়ে হয়েছে ৪৯ টাকা ৩৮ পয়সা।

ব্যাংকটির সমন্বিত মূলধনের বিপরীতে মুনাফার হার (আরওই) দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং সম্পদের বিপরীতে মুনাফার হার (আরওএ) হয়েছে ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

সুদ থেকে আয় এবং সুদবহির্ভূত আয়—দুই ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধির ফলে বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির সমন্বিত মোট আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়েছে।

খেলাপি ঋণও কমেছে

ব্র্যাক ব্যাংকের সম্পদমানেও উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথমার্ধ শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশে।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা বলছে, বৈচিত্র্যময় ঋণ পোর্টফোলিও, সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী সুশাসনের কারণে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পদের মানও ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

‘ব্যবসায়িক মডেলের দৃঢ়তার প্রতিফলন’

প্রথমার্ধের আর্থিক ফলাফল সম্পর্কে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, চলতি বছরের প্রথমার্ধের এই পারফরম্যান্স তাদের ব্যবসায়িক মডেলের দৃঢ়তা, সুশাসন ও সুশৃঙ্খল বাস্তবায়নের প্রতিফলন।

তিনি বলেন, গ্রাহকদের অব্যাহত আস্থার কারণেই ব্যাংকটি ব্যাংক খাতের গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। একই সঙ্গে তারা শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী সম্পদমান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য টেকসই দীর্ঘমেয়াদি মূল্য তৈরি করাই আগামী দিনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, গ্রাহকদের আস্থা, পরিচালনা পর্ষদের কৌশলগত দিকনির্দেশনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এবং ব্যাংকের কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা ছাড়া এই অর্জন সম্ভব হতো না। সুশাসন, উদ্ভাবন, স্বচ্ছতা ও গ্রাহকসেবার মান বজায় রেখে টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ব্যাংক খাতে নানা ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও ব্র্যাক ব্যাংকের প্রথমার্ধের আর্থিক ফলাফল মুনাফা, আমানত, ঋণ, পরিচালন দক্ষতা ও সম্পদমান—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরেছে।