এনবিআরের জাদুঘরে ইতিহাসের সাক্ষী, ৪০০ বছরের পুরোনো সনদ

চোরাচালান প্রতিরোধে কাস্টমসের অভিযানে উদ্ধার হওয়া সোনা, দুর্লভ মূর্তি কিংবা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা পণ্যের নমুনার পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অস্থায়ী জাদুঘরে স্থান পেয়েছে প্রায় চার শতাব্দী আগের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঐতিহাসিক দলিলের অনুলিপি। এসব দলিল শুধু রাজস্ব বিভাগের ইতিহাস নয়, ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্যিক প্রবেশের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এনবিআর আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলন উপলক্ষে স্থাপিত এই অস্থায়ী জাদুঘরে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে ১৬০১ সালে ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথের দেওয়া একটি বাণিজ্য অনুমোদনের অনুলিপি। প্রায় ৪০০ বছর আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতে বাণিজ্য পরিচালনার অনুমতি দিয়ে এই সনদ দেওয়া হয়েছিল।

ইংরেজ বণিকদের উপমহাদেশে বাণিজ্য বিস্তারের ইতিহাসে এই অনুমতিপত্রের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যের পথ ধরে কীভাবে ব্রিটিশ প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশে বিস্তৃত হয়েছিল, সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সূচনাপর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও এটি বিবেচিত হয়।

জাদুঘরে রয়েছে আরও একটি ঐতিহাসিক দলিলের অনুলিপি। ১৬১৫ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ইংরেজদের ভারতে ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দিয়ে যে সনদ দিয়েছিলেন, সেটিও সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে ইংরেজ বণিকদের ভারতে বাণিজ্য করার সুযোগ পাওয়ার ধারাবাহিকতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন একই জাদুঘরে তুলে ধরা হয়েছে।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাণিজ্য ও কাস্টমস ব্যবস্থার অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক ইতিহাসের স্মারক হিসেবেও রাখা হয়েছে ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রামে একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে দেওয়া সনদের অনুলিপি। এর মাধ্যমে উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক বাণিজ্যব্যবস্থা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি ও শুল্ক ব্যবস্থার বিকাশের একটি ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

এনবিআরের এই জাদুঘর অবশ্য শুধু ঐতিহাসিক দলিলের সংগ্রহ নয়। সেখানে বিভিন্ন সময়ে কাস্টমসের হাতে আটক চোরাচালানের পণ্য ও এর অভিনব কৌশলের নমুনাও প্রদর্শন করা হয়েছে। বই, ডায়েরি, সাবান, কফির প্যাকেট, ব্যাটারি, পানির ট্যাবলেট, ছাতা কিংবা দরজার কবজার ভেতরে লুকিয়ে কীভাবে সোনা ও অন্যান্য পণ্য দেশে আনার চেষ্টা করা হয়েছে, তার নমুনা রাখা হয়েছে জাদুঘরে।

স্থলবন্দর দিয়ে উদ্ধার করা দুর্লভ মূর্তিরও প্রদর্শনী রয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে হিলি কাস্টমসের উদ্ধার করা কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি ও পিতলের কালীমূর্তি উল্লেখযোগ্য।

পুরোনো দিনের চোরাচালানের কৌশলও বাদ যায়নি এই প্রদর্শনীতে। ১৯৬৭ সালে অক্সফোর্ড ব্র্যান্ডের উঁচু জুতার ভেতরে করে চোরাই পণ্য আনার ঘটনা এবং ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমসের আটক করা বড় আকারের রেডিওর নমুনাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।

রাজস্ব সম্মেলনের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটি ঘুরে দেখেন। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, চোরাচালান প্রতিরোধে কাস্টমসের দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরাই এই জাদুঘরের অন্যতম উদ্দেশ্য

চার শতাব্দী আগের বাণিজ্য অনুমোদন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের কাস্টমস ও রাজস্ব ব্যবস্থার স্মারক—সব মিলিয়ে জাদুঘরটি যেন বাংলাদেশের বাণিজ্য ও রাজস্ব ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত দলিল হয়ে উঠেছে।