বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বিশ্বে নজিরবিহীন। ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। গত জুনের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এই হার বিশ্বের অন্য যেকোনও দেশের তুলনায় বেশি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আর্থিক স্থিতিশীলতা সূচকসহ বিভিন্ন দেশের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের হারে বাংলাদেশ এখন শীর্ষে। বাংলাদেশের পর রয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানা। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন একসময় এই তালিকার শীর্ষে থাকলেও গত দুই বছরে দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দ্রুত কমে এখন বাংলাদেশের অনেক নিচে নেমে এসেছে।
দুই বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন মাসের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ এই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা।
চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে তা বেড়েছে আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।
তবে খেলাপি ঋণের এই বিপুল বৃদ্ধি পুরোপুরি নতুন করে সৃষ্ট ঋণের কারণে হয়নি। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা ছাড়, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং হিসাবের কৌশলে যে বিপুল পরিমাণ সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নিয়মিত দেখানো হয়েছিল, এখন তার বড় অংশই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
আড়ালে থাকা ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে
গত দেড় দশকে ব্যাংক খাতে ঋণখেলাপি কম দেখানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ বাড়ানো, পরিশোধের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং নানা শিথিলতার মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত অনেক ঋণকে নিয়মিত রাখা হয়েছে।
২০১৯ সালে ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়মেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এতে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ফলে প্রকৃত ঝুঁকি আড়ালে থেকে যায়।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই, বিশেষ পরিদর্শন ও নিরীক্ষার মাধ্যমে অনিয়ম, জালিয়াতি, বেনামি ঋণ এবং দীর্ঘদিন ধরে গোপন থাকা সমস্যাগ্রস্ত ঋণের চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ফলে কাগজে-কলমে নিয়মিত থাকা অনেক ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকৃত হচ্ছে।
এ কারণে বর্তমান খেলাপি ঋণের বড় অংশকে গত দুই বছরে নতুন করে তৈরি হওয়া ঋণ হিসেবে দেখলে প্রকৃত পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। বরং বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কয়েকটি ব্যাংক
ব্যাংক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতির চেয়েও কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থা ভয়াবহ। একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি। এর বাইরে সরকারি ও বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ যাচাই, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া ঋণ বিতরণ, বেনামি ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ এবং দুর্বল তদারকি— এসব কারণে ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ আটকে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবসায় মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো নতুন চাপ।
শুধু বড় ঋণ নয়, ছোট ঋণেও সংকট
খেলাপি ঋণের সমস্যা এখন শুধু বড় ব্যবসায়ী বা বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ‘ব্যাংকিং খাতের হালনাগাদ’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হিসাবের সংখ্যা এক বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গত মার্চে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজারে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার।
এর বড় অংশই খুচরা ঋণগ্রহীতা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবারের ঋণের চাপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় স্থবিরতা এবং কৃষি ও ছোট ব্যবসায় আয় কমে যাওয়ায় অনেক ঋণগ্রহীতার পরিশোধক্ষমতা কমেছে।
বিশেষ করে কুটির শিল্প খাতের অবস্থা উদ্বেগজনক। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার ৫২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি এখন খেলাপি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চায়, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসুক। একইসঙ্গে গ্রাহকরা যেন কম সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন এবং ব্যাংকগুলোও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়।’’
তিনি বলেন, ‘‘ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে— এমন গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করছেন না, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কঠোরভাবে নজরদারি করতেও ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে।’’
আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত পুনঃতফসিল ও নবায়ন নীতিমালা রয়েছে। এর পাশাপাশি পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকের আটকে থাকা টাকা আদায় এবং ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঋণের অর্থ ফেরত আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে যারা সক্ষম, তাদের ঋণ পরিশোধে উৎসাহিত করা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।’’
বিশ্বে বাংলাদেশের পর চাদ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সর্বশেষ পাওয়া তথ্য তুলনা করলে বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চাদ। দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। তবে চাদের তথ্য ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের। এরপর দেশটি আইএমএফের এই সূচকে নতুন তথ্য দেয়নি।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ। ২০২৩ সালে দেশটির হার ছিল ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে আলজেরিয়া, যেখানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে ঘানা—২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনও এখন বাংলাদেশের নিচে
বাংলাদেশের পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝার জন্য ইউক্রেনের সঙ্গে তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের কারণে প্রায় চার বছর ধরে দেশটির অর্থনীতি ও অবকাঠামো মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে। একসময় ইউক্রেনের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল। কিন্তু গত দুই বছরে দেশটি পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায়, পুনর্গঠন এবং সম্পূর্ণ সঞ্চিতি রাখা কিছু ঋণ হিসাব থেকে অবলোপনের পাশাপাশি নতুন ও ভালো মানের ঋণ বাড়িয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণের অনুপাত দ্রুত কমেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও ইউক্রেনে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা নেমে আসে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশে। চলতি বছরের জুলাইয়ে আরও কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশে, যা প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে দেশটির সর্বনিম্ন।
তবে ঋণ অবলোপন মানে ঋণ মাফ করে দেওয়া নয়। এসব ঋণের বিপরীতে আগে থেকেই শতভাগ সঞ্চিতি রাখা ছিল। হিসাবের মূল স্থিতিপত্র থেকে ঋণ সরিয়ে নেওয়া হলেও গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অধিকার ব্যাংকের থাকে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘খেলাপি ঋণের এত উচ্চ হার বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে দুই দেশের তথ্যের সময়কাল, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা এবং হিসাব পদ্ধতির পার্থ্থক্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।’’
তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা ও দীর্ঘদিনের অনিয়ম চিহ্নিত করার ফলে এখন ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসছে। এই পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, দ্রুত ঋণ আদায় এবং ব্যাংক খাতে কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।’’
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’’
এশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশ একেবারেই ব্যতিক্রম
বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার শুধু বিশ্বের তুলনায় নয়, এশিয়ার তুলনাতেও অস্বাভাবিক বেশি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে এশিয়ার ব্যাংক খাতে গড় খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে ভারতের খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নেপালের ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে সিঙ্গাপুরে ১ দশমিক ৩ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
চীনের খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় দেড় শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার এশিয়ার গড়ের প্রায় ২০ গুণ।
২০০৯ সালে ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের দীর্ঘমেয়াদি চিত্রও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১০ সালেও খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ।
এরপর দীর্ঘ সময়ে ঋণ বিতরণে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ বাড়তে থাকায় খেলাপি ঋণ ক্রমেই বেড়েছে। ২০২৩ সালের শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের শেষে তা বেড়ে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা হয়। এরপর একের পর এক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ চিহ্নিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
শুধু ছাড় দিয়ে সমাধান হবে না
খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতির নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করছে। দুর্বল ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিও জোরদার করা হয়েছে।
তবে একইসঙ্গে ঋণ পুনঃতফসিল ও বিভিন্ন বিশেষ সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। বড় ঋণগ্রহীতাদের দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিল এবং অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে কাগজে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে টাকা আদায় না হলে ব্যাংকের মূল সমস্যা থেকে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ এবং নতুন করে খারাপ ঋণ সৃষ্টি ঠেকানো— এই চারটি বিষয় নিশ্চিত না হলে খেলাপি ঋণের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
কারণ, পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ কম দেখানো যায়, কিন্তু ব্যাংকে টাকা ফেরানো যায় না। তাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু খেলাপি ঋণের হার কমানো নয়; বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে এনে প্রকৃত অর্থে ঋণের টাকা উদ্ধার করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের ভার বহন করছে—এটি কোনোভাবেই ভালো খবর নয়। এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। তবে এক-দুই বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা গেলে এ সংকট কাটিয়ে উঠতে অন্তত পাঁচ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে।’’
তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধার করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় মূলধন জোগান দিতে হবে। সরকার যদি ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খাতে বিনিয়োগ করে এবং একইসঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংককে তার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’’
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘‘অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে ব্যাংক খাতের এই ভয়াবহ খেলাপি ঋণ কমাতেই হবে। ব্যাংক খাত দুর্বল রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তাই খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সুশাসন, জবাবদিহি ও ঋণ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’’