ফেব্রিক্স আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন উদ্বেগ পোশাক খাতে

তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের নিটওয়্যার শিল্পের উৎপাদন যখন ব্যাহত হচ্ছে, তখন নতুন আমদানি নীতি অনুযায়ী নিট ফেব্রিক্স আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রফতানি আদেশ ঠিক রাখতে যেখানে অনেক কারখানাকে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় ফেব্রিক্স আমদানি করতে হচ্ছে, সেখানে নতুন নীতির কারণে সেই আমদানিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন রফতানিকারকরা।

রফতানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) বলছে, বর্তমান বাস্তবতায় নিট ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ বন্ধ করা হলে শুধু কারখানাগুলোই সমস্যায় পড়বে না, নির্ধারিত সময়ে রফতানি আদেশ পূরণ, বৈদেশিক ক্রেতাদের আস্থা এবং দেশের রফতানি আয়— সবকিছুর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণে আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯ এর ধারা ২৫ এর উপধারা ১২-তে থাকা ‘নিট ফেব্রিক্স আমদানি যোগ্য হবে না’ বিধানটি স্থগিত বা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বিকেএমইএ।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্যমন্ত্রীকে দেওয়া এক চিঠিতে এ দাবি জানান সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

গ্যাস সংকটেই চাপে উৎপাদন

রফতানিকারকদের উদ্বেগের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বর্তমানে চলমান গ্যাস সংকট। নিটওয়্যার খাতের একটি বড় অংশের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্যাসের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে ফেব্রিক্স তৈরি, রঙ করা, ধোয়া ও বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক শিল্পকারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে দেশের ভেতরে প্রয়োজন অনুযায়ী ফেব্রিক্স উৎপাদন করাও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিদেশি ক্রেতাদের দেওয়া রফতানি আদেশ সময়মতো পূরণ করতে কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিদেশ থেকে ফেব্রিক্স সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

বিকেএমইএ বলছে, রফতানি ব্যবসায় সব ধরনের ফেব্রিক্স শুধু দেশীয় উৎস থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। ক্রেতার নির্দিষ্ট মান, নকশা, কাপড়ের ধরন, রঙ, গুণগত বৈশিষ্ট্য এবং পণ্যের বৈচিত্র্যের কারণে অনেক সময় নির্দিষ্ট ফেব্রিক্স বিদেশ থেকেই আমদানি করতে হয়।

অর্থাৎ, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি এবং ক্রেতার নির্দিষ্ট চাহিদা– দুই কারণেই বিদেশ থেকে ফেব্রিক্স আনার প্রয়োজন হতে পারে।

পুরোনো এলসির পণ্য নিয়েও উদ্বেগ

বিকেএমইএ’র চিঠিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, তা হলো, নতুন আমদানি নীতি প্রকাশের আগেই অনেক রফতানিকারক বিদেশ থেকে ফেব্রিক্স আনার জন্য ঋণপত্র বা এলসি খুলেছেন।

এসব এলসির বিপরীতে কিছু ফেব্রিক্স ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে। আবার অনেক চালানের আমদানি প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

নতুন নীতিতে নিট ফেব্রিক্স আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় এসব পণ্য খালাস নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিকেএমইএ।

সংগঠনটির বক্তব্য, এসব পণ্য সময়মতো খালাস করা না গেলে সংশ্লিষ্ট রফতানিকারকদের উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিদেশি ক্রেতাদের দেওয়া রফতানি আদেশের ওপর।

কারণ তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজারে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতার আস্থা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আদেশও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ভুলক্রমে অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছিল

বিকেএমইএ’র চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, আমদানি নীতির এই বিধান নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আগের একটি সভায় আলোচনা হয়েছিল। তখন সংশ্লিষ্ট বিধানটি ভুলক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল এবং তা সংশোধনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।

তবে ২৪ আগস্ট প্রকাশিত চূড়ান্ত আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯-এ সেই বিধান বহাল রাখা হয়েছে।

এতে রফতানিকারকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, যে বিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত কেন বহাল থাকল।

কেন বিদেশি ফেব্রিক্সের প্রয়োজন?

রফতানি বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাত মূলত বিদেশি ক্রেতাদের নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে। একটি নির্দিষ্ট পোশাকের জন্য কোনও ধরনের কাপড় ব্যবহার হবে, তার গুণগত মান কী হবে, কী রঙ বা নকশা থাকবে– এসব অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেতা নির্ধারণ করে দেন।

ফলে কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেশীয় কারখানায় একই মান বা বৈশিষ্ট্যের ফেব্রিক্স পাওয়া না গেলে বিদেশ থেকে তা সংগ্রহ করতে হয়।

এছাড়া গ্যাস সংকটের কারণে দেশীয় ফেব্রিক্স উৎপাদন ব্যাহত হলে বিদেশি উৎস থেকে কাঁচামাল আনা রফতানি আদেশ ধরে রাখার একটি বিকল্প পথ হয়ে ওঠে।

রফতানিকারকদের মতে, এই বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে নিট ফেব্রিক্স আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা হলে উৎপাদন ও রফতানি– দুই দিকেই চাপ তৈরি হতে পারে।

রফতানি আয়েও প্রভাবের আশঙ্কা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে এই খাতের উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু উদ্যোক্তা বা কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা হলে সময়মতো পণ্য রফতানি করা কঠিন হতে পারে। এতে ক্রেতার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে গ্যাস সংকটের মতো একটি বড় উৎপাদন সমস্যা চলমান থাকা অবস্থায় কাঁচামাল আমদানির ওপর নতুন বাধা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিকেএমইএর দাবি কী

এই বাস্তবতায় রফতানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯ এর ধারা ২৫ এর উপধারা ১২ স্থগিত অথবা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছে বিকেএমইএ।

সংগঠনটির যুক্তি, রফতানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নমনীয়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের আগে থেকেই এলসি খোলা রয়েছে এবং যেসব পণ্য ইতোমধ্যে দেশে এসে পৌঁছেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে যাতে কোনও ধরনের জটিলতা তৈরি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

চিঠিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বিজিএমইএ সভাপতিকেও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রফতানি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা ও নির্দেশনা অনুযায়ী দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়। বিশেষ করে বর্তমান তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশের রফতানিমুখী নিটওয়্যার শিল্প, এর মধ্যে ফেব্রিক্স উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

একইসঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা, নির্ধারিত মান ও নকশা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রয়োজনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে ফেব্রিক্স আমদানি করা প্রয়োজন হয় বলেও জানান তিনি।

সব মিলিয়ে গ্যাস সংকটে যখন দেশের নিটওয়্যার শিল্প উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা করছে, তখন নিট ফেব্রিক্স আমদানিতে নতুন বিধিনিষেধ রফতানিকারকদের জন্য বাড়তি চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখন সরকারের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে– বিদ্যমান উৎপাদন সংকটের মধ্যে রফতানিকারকদের জন্য ফেব্রিক্স আমদানির এই পথ কতটা খোলা থাকবে।