গাজীপুরে একটি সিগারেট কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে ৭২ কোটি টাকার ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকির তথ্য উদঘাটনের দাবি করেছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি বৈধ ব্যান্ডরোল ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যবহৃত ও নকল ব্যান্ডরোল দিয়ে গোপনে সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করছিল।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর)এনবিআর জানায়, অভিযানের সময় কারখানার ভেতরে প্রায় ৫০ লাখ শলাকা নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট পুড়িয়ে ফেলার আলামতও পাওয়া গেছে। বলে এসব সিগারেট ধ্বংস করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তার কোনও অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের ঢাকার প্রিভেন্টিভ টিম গত ২ সেপ্টেম্বর গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুর সদর এলাকায় অবস্থিত ভিরগো টোব্যাকো লিমিটেডে অভিযান চালায়। একইসঙ্গে কারখানার কাছাকাছি একটি গুদামেও অভিযান চালানা হয়।
গেট বন্ধ রেখে চলছিল উৎপাদন
ভ্যাট গোয়েন্দার দুটি দল একযোগে কারখানা ও পাশের গুদামে অভিযান চালায়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় কারখানার গেট বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। বারবার গেট খুলতে বলা হলেও ভেতর থেকে কেউ সাড়া দেয়নি।
পরে গোয়েন্দা দলের সদস্যরা দেয়াল টপকে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা সিগারেট উৎপাদনের কার্যক্রম দেখতে পান। কারখানা চত্বরে ধোঁয়া দেখে সেখানে গিয়ে কর্মকর্তারা দেখেন ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল এবং নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।
পোড়ানো সিগারেট ও ব্যান্ডরোল ধ্বংসের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দলিল ও অনুমোদন দেখাতে বলা হলে সংশ্লিষ্টরা তা দেখাতে পারেননি। বিভাগীয় কর্মকর্তার অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে কোনও অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে তারা জানান।
পরে প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার লিখিত বিবৃতিতে প্রায় ৫০ লাখ শলাকা নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট পুড়িয়ে ফেলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অভিযানের সময় পোড়া ব্যান্ডরোলের অবশিষ্টাংশ আলামত হিসেবে জব্দ করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
মোবাইল ফোনের চ্যাটে মিলেছে গোপন হিসাব
অভিযান শেষে কারখানা ও সংলগ্ন গুদাম এবং আবাসিক ভবনে তল্লাশি চালিয়ে ব্যবহৃত স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল, সিগারেট উৎপাদনের বিভিন্ন কাঁচামাল এবং তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
এ ছাড়া কারখানায় কয়েকটি বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেটের নমুনা ও খালি প্যাকেটও পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে বলে জানিয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।
জব্দ করা মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণে নামে ভ্যাট গোয়েন্দার আইটি ও সাইবার ফরেনসিক টিম। সংস্থাটির দাবি, মোবাইল ফোনগুলোর চ্যাট হিস্ট্রি, বিক্রয়সংক্রান্ত গোপন বার্তা এবং হিসাবের ছবি বিশ্লেষণ করে সিগারেট বিক্রির বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদিত সিগারেটের একটি বড় অংশ কোনও ভ্যাট চালান বা মূসক-৬.৩ ছাড়াই বাজারে সরবরাহ করে আসছিল। এসব লেনদেন প্রতিষ্ঠানের মূল হিসাবেও গোপন রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা।
বৈধ ব্যান্ডরোলের পাশাপাশি ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল
ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বৈধ স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল ব্যবহারের পাশাপাশি আগে ব্যবহার করা স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল দিয়ে গোপনে সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করছিল।
জব্দ করা পণ্য, নথি এবং মোবাইল ফোন থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রাথমিক হিসাব করে সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাবদ প্রায় ৭২ কোটি ৫০ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে এটি প্রাথমিক হিসাব। তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই শেষে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণে পরিবর্তন হতে পারে।
মামলা
ঘটনার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ১৪ সেপ্টেম্বর মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নম্বর ১৭/২০২৬।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ, জাল স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোলের ব্যবহার এবং রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে দেশব্যাপী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।