নীতি সুদহার অপরিবর্তিত, নজরে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমে না আসা এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘায়িত সংঘাত এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুদ্রানীতি কমিটি (এমপিসি)।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এমপিসির ১৪তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমলেও তা এখনো সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

এ অবস্থায় নীতি সুদহার পরিবর্তন না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পথ বেছে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতিতে কতটা ছড়িয়ে পড়ে, তা দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানির দাম বড় ঝুঁকি

এমপিসির পর্যালোচনায় মূল্যস্ফীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে—এমন কয়েকটি ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে দেশের বাজারে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামেও পড়তে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বেতন কাঠামোর প্রভাবও নজরে

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রভাবও মূল্যস্ফীতির ওপর পড়তে পারে বলে মনে করছে এমপিসি।

নতুন বেতন কাঠামোর ফলে মানুষের আয় ও ভোগব্যয় বাড়লে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়তে পারে। একই সময়ে জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নতুন বেতন কাঠামো এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি—দুদিকেই নজর

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এখনই নীতি সুদহারে পরিবর্তন না এনে সাম্প্রতিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোর প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এসব অভিঘাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি এবং ভোক্তা মূল্যসূচকভিত্তিক মূল্যস্ফীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এমপিসি।

অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যাতে অতিরিক্ত চাপে না পড়ে, সেটিও বিবেচনায় রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এমপিসির সর্বশেষ সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমান নীতি সুদহারই বহাল থাকছে। পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন বিবেচনা করে নীতি সুদহার নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সভায় এমপিসির সদস্য ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারপারসন ড. ফেরদৌসী নাহার এবং মুদ্রানীতি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমাম আবু সাঈদ উপস্থিত ছিলেন।