শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে এবার! 

দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একদিকে বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার প্রবণতা বেড়েছে, অপরদিকে দীর্ঘ আড়াই বছরের খরা কাটিয়ে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির শিকার বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শেয়ার সরবরাহ বাড়ানো, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে বাজারে আস্থা ফিরতে পারে। তবে বাজারের স্থায়ী উন্নতির জন্য সুশাসন, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিদেশিদের শেয়ার কেনা বেড়েছে

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। বিপরীতে বিক্রি করেছেন প্রায় ১৮০ কোটি টাকার শেয়ার। ফলে ওই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা।

সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনের মধ্যে কার্যদিবস ছিল ১৬টি। এর মধ্যে ১৩ কার্যদিবসেই বিদেশিদের শেয়ার কেনার পরিমাণ বিক্রির চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ কয়েক মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাজারে সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ডিএসইর তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন নেমে এসেছিল মাত্র ৭৩ কোটি ৯২ লাখ টাকায়। জুনে তা বেড়ে প্রায় ৫৪০ কোটি এবং জুলাইয়ে প্রায় ৫২৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আগস্টে মোট লেনদেন কমে প্রায় ৩১৮ কোটি টাকায় নেমে এলেও সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই তা ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক শেয়ার কেনা দেশের বাজার সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি হবে কিনা, তা নির্ভর করবে বাজারের নীতিগত পরিবেশ, কোম্পানির মৌলভিত্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

নীতিতে পরিবর্তন, সহজ হচ্ছে বিনিয়োগ

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারের পরিবেশ সহজ করতে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার অন্যতম।

পাশাপাশি ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন দেশি ও বিদেশি কোম্পানিকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সুযোগ দিতে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মার্জিন ঋণসংক্রান্ত নিয়ম সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সূচক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআইও বাংলাদেশ নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যালোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ফ্লোর প্রাইসসংক্রান্ত জটিলতার কারণে ২০২৩ সালে বাংলাদেশকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। নিয়মিত পর্যালোচনায় ফিরে আসার বিষয়টি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারের কাঠামোগত পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের অর্থ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। আগে শেয়ার বিক্রির অর্থ বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সীমা বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা করেছে। প্রতিটি লেনদেনে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠানের সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে।

নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির উদ্যোগ

দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির গতি কম। এই সংকট কাটাতে আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি।

সরকারি-বেসরকারি, দেশি-বিদেশি এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনার মাধ্যমে ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, কনফিডেন্স পাওয়ার, টিকে স্টিল, র‌্যাংকস পেট্রোলিয়াম, র‌্যানকম মোটরবাইক ও ফাইবার অ্যাট হোমসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বাজার বিশ্লেষক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ২০১০ সালের ধসের পর দেশের পুঁজিবাজার কাঙ্ক্ষিতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর পেছনে সুশাসনের ঘাটতি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ বাজারে নতুন শেয়ার সরবরাহ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিএসইর সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডিবিএর সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো বাজারে এলে বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো শেয়ারের বিকল্প বাড়বে। এতে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত

শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির শিকার বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করেছে ডিএসই।

প্রথম দফায় মশিউর সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। ২৮ সেপ্টেম্বর উদ্বোধনী দিনে ১৫ জন বিনিয়োগকারীর মধ্যে চেক হস্তান্তর করা হয়। পরদিন মশিউর সিকিউরিটিজের আরও ১২২ জন বিনিয়োগকারীকে মোট ৩ কোটি ২১ লাখ ৫৭ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনায় ডিএসইর বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল (আইপিএফ) থেকে এ অর্থ দেওয়া হচ্ছে।

ডিএসই জানিয়েছে, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির ঘটনায় পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ১৭ হাজার ৯২৫ জন বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠান হলো—মশিউর সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, বাঙ্কো সিকিউরিটিজ এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোম্পানি।

এরই মধ্যে আইপিএফ ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এখন অবশিষ্ট পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডিএসইর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীর প্রত্যেকের সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওনা আইপিএফ থেকে পরিশোধ করা হবে। এতে প্রায় ৯৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর পুরো পাওনা ফেরত দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ বাবদ মোট প্রায় ৭২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে।

অপরদিকে, ৫৯৫ জন বড় বিনিয়োগকারীর ৫ লাখ টাকার বেশি যে পাওনা রয়েছে, তা আদায়ে খেলাপি ব্রোকারেজ হাউসগুলোর শেয়ার, সম্পত্তি ও পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রির আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে ডিএসই।

নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ

ভবিষ্যতে কোনও ব্রোকারেজ হাউস যাতে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করতে না পারে, সে জন্য প্রতিটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে সমন্বিত ও সুরক্ষিত ‘ইউনিফাইড ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার’ এবং ‘অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস)’ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মাধ্যমে ডিএসই ও বিএসইসি সরাসরি গ্রাহকের হিসাবের হালনাগাদ তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।

দেশের তালিকাভুক্ত প্রায় ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে ১৩২টি কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। ব্র্যাক ব্যাংক, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও রেনাটাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদেশিদের উল্লেখযোগ্য শেয়ারধারণ রয়েছে।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের নামে খোলা বিও হিসাবের সংখ্যা ৪১ হাজার ৯৩৭টি।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ— এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর সঙ্গে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের শেয়ারবাজারে টেকসই গতি ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে।