চাকরি তৈরিতে ট্রিলিয়ন ডলারের পুঁজির দিকে বিশ্বব্যাংকের নজর

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের (এমএসএমই) অর্থায়ন সহজ করা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ানো এবং উন্নয়ন অর্থায়নে বেসরকারি মূলধনকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে বিশ্বব্যাংক–আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায়।

‘বেসরকারি মূলধনকে কাজে লাগানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আগামী ১২ থেকে ১৬ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে এ বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভাকে সামনে রেখে নিবন্ধিত সাংবাদিকদের পাঠানো এক বার্তায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপ এসব তথ্য জানিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি তার ইতিহাসের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি বেসরকারি মূলধন সংগ্রহে সক্ষম হয়েছে। একই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ গ্যারান্টি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে নিজেদের অর্থায়নের পাশাপাশি আরও বেশি বেসরকারি মূলধন কাজে লাগানোর দীর্ঘদিনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের এবারের উদ্যোগ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অবকাঠামো, শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারি অর্থের পাশাপাশি বেসরকারি মূলধন আকর্ষণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে উৎসাহিত করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ।

কর্মসংস্থানই মূল লক্ষ্য

বিশ্বব্যাংকের এবারের বার্ষিক সভায় তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর প্রথমটি হলো উন্নয়ন অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকার পরিবর্তন এবং নিজেদের অর্থের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে কাজে লাগানো।

বিশ্বব্যাংক বলছে, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি না হলে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন। তাই বিনিয়োগের সঙ্গে চাকরি সৃষ্টিকে সরাসরি যুক্ত করার ওপর জোর দিচ্ছে সংস্থাটি।

এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের নতুন কৌশল হলো— শুধু নিজস্ব অর্থায়ন দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা। এতে সীমিত সরকারি ও উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবহার করে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

এআই দিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

বার্ষিক সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হচ্ছে ‘স্মল এআই: মোর অ্যান্ড বেটার জবস’ ।১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এই অধিবেশনে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট আজয় বাঙ্গা বিভিন্ন দেশের সরকার ও প্রযুক্তি উদ্ভাবকদের সঙ্গে এআই নিয়ে আলোচনা করবেন।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এআই বিপ্লবের জন্য সব সময় বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে না। তুলনামূলক কম খরচে ব্যবহার করা যায় এমন এআই প্রযুক্তি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ক্ষেত্রে শুধু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা বড় আকারের এআই প্রকল্পের দিকে নজর না দিয়ে ছোট ও বাস্তবভিত্তিক প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে ব্যবহার করা যায়, সেটিই গুরুত্ব পাবে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে যেমন কিছু প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যেতে পারে, তেমনি নতুন ধরনের কাজ ও ব্যবসার সুযোগও তৈরি হতে পারে। এআইয়ের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, ব্যবসার খরচ কমানো এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করাও আলোচনার অংশ হবে।

এসএমইকে ঋণ দিতে কাজে লাগবে তথ্য

১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে ‘MSME Finance: Leveraging Data for Jobs’ শীর্ষক অধিবেশন।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বিশ্বের অধিকাংশ কর্মসংস্থান ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করে। কিন্তু এসব ব্যবসার বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগও সীমিত থাকে।

এই বাস্তবতায় ডিজিটাল তথ্য ব্যবহার করে কীভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়নের আওতায় আনা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করবেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট আজয় বাঙ্গা ও আর্থিক খাতের নেতারা।

প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থায় ছোট ব্যবসার পর্যাপ্ত নথিপত্র বা জামানত না থাকায় অনেক সময় ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হয়। ডিজিটাল লেনদেন, ব্যবসার তথ্য ও অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হলে অর্থায়নের পরিধি বাড়তে পারে—এমন ধারণাই সামনে রেখে আলোচনা হবে এই অধিবেশনে।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও এ বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। কারণ ছোট ব্যবসায় অর্থায়নের সুযোগ বাড়লে উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।

উন্নয়নশীল দেশে পড়ে থাকা পুঁজি কাজে লাগানোর চেষ্টা

১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে এবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন ‘Unlocking Investment in Emerging Markets to Create Jobs’।

বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য, বিশ্বজুড়ে ট্রিলিয়ন ডলারের বেসরকারি মূলধন বিনিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে বিনিয়োগযোগ্য বিপুল অর্থ পড়ে আছে, অন্যদিকে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে—কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি হচ্ছে না।

কিভাবে এই বেসরকারি অর্থ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারে নিয়ে আসা যায় এবং এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করবেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট, বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরা।

বিশেষ করে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো, নীতিগত সহায়তা, নিয়ন্ত্রক পরিবেশ এবং প্রকল্প প্রস্তুতির মতো বিষয়গুলো বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এখন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং রপ্তানিমুখী নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি মূলধনকে উন্নয়ন অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করার কৌশল বাংলাদেশের জন্যও আগ্রহের বিষয়। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা হলে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের পরিধি বাড়ানো সম্ভব। তবে এর জন্য ব্যবসার পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থায়ন সুবিধা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

১৬ অক্টোবর বার্ষিক সভার সমাপনী প্লেনারি অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরবেন প্রেসিডেন্ট আজয় বাঙ্গা।

বার্ষিক সভার বিভিন্ন আলোচনায় বেসরকারি মূলধন, কর্মসংস্থান, এআই, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় অর্থায়নকে গুরুত্ব দেওয়ার পর সমাপনী অধিবেশনে বিশ্বব্যাংকের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্ট হতে পারে।

ব্যাংককে শেষে সিউলে এআই সম্মেলন

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভা শেষ হওয়ার পরপরই ১৯ থেকে ২২ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত হবে গ্লোবাল এআই অ্যান্ড ডিজিটঅর সামিট।

সেখানে ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হবে।

অর্থাৎ ব্যাংকের বার্ষিক সভায় বেসরকারি মূলধন ও কর্মসংস্থানকে সামনে রেখে যে আলোচনা শুরু হবে, পরবর্তী সিউল সম্মেলনে তার সঙ্গে প্রযুক্তি ও এআইয়ের সম্পর্ক আরও গুরুত্ব পাবে।

এবারের বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হবে ব্যাংকের Queen Sirikit National Convention Center-এ। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত অধিবেশনগুলো সরাসরি সম্প্রচারের পাশাপাশি পরে দেখার সুযোগও থাকবে।