বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগ বাড়াতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই দুই সংস্থার কাছ থেকে অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে এখন বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে সংস্কারের অগ্রগতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা এবং নেওয়া ঋণ কার্যকরভাবে ব্যবহারের নিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে আগামী বছর বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বাংলা ট্রিবিউনকে ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে দুই সংস্থার আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। ঋণ কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনাকে যে মাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আগামী বছর বাংলাদেশও তেমন গুরুত্ব পেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, গুরুত্বের বিবেচনায় বাংলাদেশকে ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টিকে আপাতত ওই কর্মকর্তার বক্তব্য ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের জন্য এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও আর্জেন্টিনার সঙ্গে তুলনার বিষয়টি কয়েকটি প্রশ্নকে সামনে আনে। কেন দেশটি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাছ থেকে বড় অঙ্কের সহায়তা পাচ্ছে? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুই সংস্থার অবস্থান কেন তুলনামূলক সতর্ক? আর আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়াতে হলে বাংলাদেশকে কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে হবে?
বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ সরকারের এক কর্মকর্তাও একই তথ্য নশ্চিত করেছেন।
আর্জেন্টিনাকে কেন এত গুরুত্ব
আর্জেন্টিনা বর্তমানে আইএমএফের সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা। দেশটির সঙ্গে সংস্থাটির দীর্ঘদিনের ঋণ সম্পর্ক রয়েছে। আগের ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে দেশটির জন্য ২ হাজার কোটি ডলারের নতুন কর্মসূচি অনুমোদন করে আইএমএফ। এর মেয়াদ ৪৮ মাস।
এই কর্মসূচির লক্ষ্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো, সরকারি অর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে দেশটির প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা। কর্মসূচিটি সফল হলে আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের সংকট কাটানোর পথ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে ব্যর্থ হলে ঋণ পরিশোধ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে। বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার কারণে কর্মসূচি সফল করার ক্ষেত্রে আইএমএফেরও স্বার্থ রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকও আর্জেন্টিনাকে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণ ও গ্যারান্টি ব্যবস্থার মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ধীরগতির মধ্যেও আর্জেন্টিনা তুলনামূলক ভালো প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাস প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। লাতিন আমেরিকার সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় এই হার বেশি।
তবে আর্জেন্টিনার অর্থনীতি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। আইএমএফের মূল্যায়নে দেশটির সংস্কার কর্মসূচিতে অগ্রগতি থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ফলাফল মিশ্র। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণে ঘাটতি রয়েছে। ২০২৭ সালে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধের চাপও তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া দারিদ্র্য, মূল্যস্ফীতি এবং সংস্কারের সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ ও শ্রমজীবীদের কাছে পৌঁছানোও দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থাৎ আর্জেন্টিনাকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, দেশটির সব সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে। বরং বড় ঋণ কর্মসূচি, সংস্কারের সম্ভাবনা এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার প্রয়োজন—এই তিনটি বিষয় দেশটিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা
বাংলাদেশের পরিস্থিতি আর্জেন্টিনার চেয়ে ভিন্ন। দেশের অর্থনীতিতে একদিকে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে রিজার্ভের অবস্থার উন্নতি, বিনিময় হার ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং আর্থিক খাত সংস্কারের কিছু উদ্যোগও রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। বিনিয়োগের দুর্বলতাকে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সরকারের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের তুলনায় এই পূর্বাভাস অনেক কম।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। জুন শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩৩ শতাংশের বেশি হওয়া, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা যুক্ত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে, এসব সমস্যা মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখলেই হবে না, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তবে ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং বিনিময় হার ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপকে সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুনে বাংলাদেশকে ১১০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। অর্থাৎ চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশের সঙ্গে সংস্থাটির অর্থায়ন ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
আইএমএফের শর্ত ও সংস্কারের চাপ
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইএমএফের প্রধান উদ্বেগ রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং বিনিময় হার সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে। ২০২৩ সালে অনুমোদিত ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে অর্থ দেওয়া হলেও সংস্কারের গতি ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে সংস্কারের কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকায় ঋণের কিস্তি ছাড় নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। পরে সরকার নতুন কর্মসূচির বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে পুরোনো কর্মসূচির বাকি অর্থ, নতুন কর্মসূচির শর্ত এবং অর্থ ছাড়ের বর্তমান অবস্থা আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আইএমএফের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, সংস্কারের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করা। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ কমানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারলে বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক সহায়তা পেলেও তার সুফল সীমিত থাকতে পারে।
সহায়তা বাড়াতে যেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি জরুরি
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা ইতিবাচক হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ বা সম্মেলনে বাড়তি গুরুত্ব পাওয়ার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ফলাফল বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সাধারণত অর্থায়নের পাশাপাশি সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা বিবেচনা করে।
প্রথমত, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি টেকসই করা কঠিন।
তৃতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। জ্বালানি সরবরাহ, নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এবং অর্থায়নের সুযোগে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না।
চতুর্থত, সংস্কারের সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে থাকা মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না।
আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
আর্জেন্টিনার উদাহরণ দেখায়, আন্তর্জাতিক সংস্থার বড় অঙ্কের সহায়তা একটি দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই সহায়তা নিজে থেকেই সংকটের সমাধান করে না। অর্থনৈতিক কর্মসূচির ধারাবাহিকতা, নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
আর্জেন্টিনার জন্য আইএমএফের কর্মসূচি ২০২৫ সালে অনুমোদিত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংকের অংশীদারিত্ব কাঠামোও দীর্ঘমেয়াদি। ফলে দেশটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া কোনও আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। একই সঙ্গে ঋণের চাপ, রিজার্ভের ঘাটতি এবং দারিদ্র্যের মতো সমস্যা দেখিয়ে দেয়, অর্থায়ন বাড়লেই অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। ব্যাংকক সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্য দুই সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সম্ভাবনা সম্পর্কে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। তবে বাংলাদেশকে আর্জেন্টিনার মতো গুরুত্ব দেওয়া হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা সিদ্ধান্তও পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আস্থা অর্জন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বাড়তি সহায়তা অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে ব্যাংক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে।