ভেজাল স্বর্ণ কিনছেন না তো, খাঁটিত্ব যাচাই করবেন যেভাবে

স্বর্ণের দাম এখনও আকাশছোঁয়া। যদিও গত দুই দিনের ব্যবধানে দেশের বাজারে সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা। দাম কমলেও সাধারণ ক্রেতার কাছে স্বর্ণের গয়না কেনা এখনও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। কিন্তু এত টাকা খরচ করে যে গয়না কিনছেন, সেটি আসলেই কতটা খাঁটি? গয়নার গায়ে লেখা ক্যারেটের সঙ্গে ভেতরে থাকা সোনার বিশুদ্ধতার মিল আছে তো? নাকি কম মানের সোনা কিনে বেশি দাম দিচ্ছেন?

স্বর্ণের বাজারে দামের ওঠানামার পাশাপাশি এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ শুধু গয়নার রং বা বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে স্বর্ণের বিশুদ্ধতা বোঝার উপায় নেই। কত ক্যারেটের স্বর্ণ কিনছেন, গয়নায় হলমার্ক আছে কিনা, বিক্রেতা নির্ভরযোগ্য কিনা এবং ক্যাশমেমোতে স্বর্ণের মান উল্লেখ করা হয়েছে কিনা— এসব যাচাই না করলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ক্যারেটেই বোঝা যায় কতটা খাঁটি স্বর্ণ 

স্বর্ণের বিশুদ্ধতা পরিমাপের প্রচলিত মানদণ্ড হলো ক্যারেট। খাঁটি স্বর্ণ ২৪ ক্যারেটের। তবে খাঁটি স্বর্ণ তুলনামূলক নরম হওয়ায় গয়না তৈরির সময় এর সঙ্গে রুপা, তামা বা অন্য ধাতু মেশানো হয়। এতে গয়না শক্ত ও ব্যবহার উপযোগী হয়। মিশ্র ধাতুর পরিমাণের ওপর নির্ভর করে স্বর্ণের ক্যারেট ও বিশুদ্ধতা।

বাংলাদেশের বাজারে সাধারণত ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেট এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের গয়না বিক্রি হয়। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত বিশুদ্ধতার চিহ্ন অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের স্বর্ণে ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ, ২১ ক্যারেটে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১৮ ক্যারেটে ৭৫ শতাংশ খাঁটি সোনা থাকে।

অপরদিকে ২৪ ক্যারেটের স্বর্ণের ক্ষেত্রে ৯৯৯ চিহ্নটি প্রায় ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধতা বোঝায়। ২২ ক্যারেটের ক্ষেত্রে ৯১৬, ২১ ক্যারেটে ৮৭৫ এবং ১৮ ক্যারেটে ৭৫০ চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।

অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের গয়না কিনলে তার সবটুকুই স্বর্ণ হওয়ার কথা নয়। এর প্রায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ অন্য ধাতু থাকতে পারে। একইভাবে ১৮ ক্যারেটের গয়নায় এক-চতুর্থাংশ অন্য ধাতু থাকে। তাই গয়নার ক্যারেট না বুঝে শুধু দাম বা নকশা দেখে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

কম ক্যারেট মানেই কি খারাপ স্বর্ণ?

কোন ক্যারেটের গয়না কেনা লাভজনক, তা নির্ভর করে ক্রেতার প্রয়োজন ও পছন্দের ওপর। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনও ক্যারেটের সোনার গয়না কেনা যেতে পারে। কম ক্যারেট মানেই গয়নার মান খারাপ— এমন ধারণা ঠিক নয়। বিদেশে ৯ ক্যারেটের গয়নাও তৈরি হয়।’ 

তবে যে মানের স্বর্ণ কেনা হবে, সেটি সঠিকভাবে উল্লেখ করা আছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। তার পরামর্শ, গয়না কেনার সময় হলমার্ক দেখে নিতে হবে। ক্যাশমেমোতেও সোনার ক্যারেট ও প্রয়োজনীয় বিবরণ উল্লেখ আছে কিনা, তা যাচাই করতে হবে।’ পাশাপাশি বাজুসের সদস্য প্রতিষ্ঠান থেকে গয়না কেনার পরামর্শ দেন তিনি।

জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে ২১ ক্যারেটের গয়নার চাহিদা বেশি। তবে মেশিনে তৈরি চুড়ি, চেইন ও ব্রেসলেটের মতো গয়না সাধারণত ২২ ক্যারেটেও তৈরি হয়। যেসব গয়নায় জটিল নকশা ও ঝালাইয়ের প্রয়োজন হয়, সেগুলো ২১ বা ১৮ ক্যারেটে তৈরি করা হতে পারে। তাই গয়নার ধরন দেখে নয়, নির্ধারিত মান যাচাই করেই কেনা উচিত।

হলমার্ক কী, কেন জরুরি?

সোনার বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হলমার্ক। এটি গয়নার স্বর্ণের মান সম্পর্কে একটি চিহ্ন বা শনাক্তকরণব্যবস্থা। তবে শুধু গয়নার গায়ে কোনও সংখ্যা বা চিহ্ন দেখেই নিশ্চিত হওয়া যাবে না যে সেটি নির্ভুলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। চিহ্নটির সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করাও জরুরি।

দেওয়ান আমিনুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে বাংলা গোল্ড ও ঢাকা গোল্ড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান সোনার গয়না পরীক্ষা করে হলমার্ক দিয়ে থাকে। পরীক্ষায় যে মানের সোনা পাওয়া যায়, সে অনুযায়ী গয়নায় লেজারের সাহায্যে চিহ্ন দেওয়া হয়। পাশাপাশি সনদও দেওয়া হয়, যা সংশ্লিষ্ট জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত থাকে।

ঢাকার বাইরে কিছু ব্যবসায়ী টোনস মেশিন দিয়ে স্বর্ণের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করেন। ব্যবসায়ীদের মতে, এ ধরনের যন্ত্র থেকেও স্বর্ণের মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে ক্রেতার উচিত পরীক্ষার পদ্ধতি, ফলাফল ও তার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।

ক্যাশমেমো ছাড়া স্বর্ণ কিনবেন না

স্বর্ণের গয়না কেনার পর ক্যাশমেমো হারিয়ে ফেললে বা না রাখলে পরবর্তী সময়ে গয়নার মান ও কেনার তথ্য প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে। তাই কেনার সময় ক্যাশমেমো নেওয়ার পাশাপাশি সেটি যত্ন করে সংরক্ষণ করা জরুরি।

ক্যাশমেমোতে গয়নার ওজন, ক্যারেট, স্বর্ণের দাম, মজুরি এবং প্রযোজ্য অন্যান্য খরচ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কিনা, তা দেখে নিতে হবে। হলমার্ক বা পরীক্ষার সনদ পাওয়া গেলে সেটিও সংরক্ষণ করা উচিত।

পুরোনো গয়না বিক্রি বা বদলে নতুন গয়না কেনার ক্ষেত্রেও এসব নথি কাজে আসে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পুরোনো গয়না বিক্রির ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ এবং পুরোনো গয়না দিয়ে নতুন গয়না তৈরির ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে কী পরিমাণ বাদ দেওয়া হবে, কেন হবে এবং কোন ভিত্তিতে হিসাব করা হচ্ছে, তা পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া উচিত।

কম দামের প্রলোভনে বাড়ছে ঝুঁকি

স্বর্ণের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কম ক্যারেটের গয়না ও বিকল্প ধাতু দিয়ে তৈরি অলংকারের চাহিদাও বেড়েছে। এর মধ্যে ব্রোঞ্জের সঙ্গে অল্প পরিমাণ স্বর্ণ মিশিয়ে তৈরি চুড়ি ও বালা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এসব পণ্যে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু স্বর্ণ আছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা না গেলে ক্রেতার প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় ১০ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের জুয়েলারি দোকানে ব্রোঞ্জের স্বর্ণের চুড়ি ও বালা বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে বাজুস। সংগঠনটির নেতারা ক্রেতাদেরও এ ধরনের পণ্য না কেনার পরামর্শ দিয়েছেন।

অপরদিকে দেশের কিছু এলাকায় বাজুসের নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে স্বর্ণের গয়না বিক্রির প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। অনলাইনেও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে গয়না বিক্রি করা হয়। ক্রেতারা সরাসরি পণ্য না দেখে অর্ডার দিলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।

দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বাজুসের নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে স্বর্ণ বিক্রির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কেউ এমন দামে বিক্রি করলে স্বর্ণের মানে কোনও সমস্যা আছে কিনা, তা যাচাই করতে হবে। অনলাইনে গয়না কেনার আগেও বিক্রেতার পরিচয়, প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা ও পণ্যের বিবরণ যাচাই করা জরুরি।’ 

দামের চেয়ে বিশুদ্ধতাকে গুরুত্ব দিন

স্বাধীনতার বছর ১৯৭১ সালে দেশে এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ১৭০ টাকা। দীর্ঘ সময়ে স্বর্ণের দাম বহুগুণ বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও দাম দ্রুত ওঠানামা করেছে। গত ২৯ জানুয়ারি ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় উঠেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর দাম কমে এলেও গয়না কেনার জন্য ক্রেতাকে এখনো বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান দোলন বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমা-বাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করেই দেশের বাজারে দাম নির্ধারণ করা হয়। বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও কমানো হয়, বাড়লে বাড়ানো হয়।’ 

সর্বশেষ দর সমন্বয়ের আগে ১৩ অক্টোবর ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা, ২২ অক্টোবর ১ হাজার ৬৯১ টাকা এবং ২৩ অক্টোবর ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমানো হয়েছিল। সবশেষ রবিবার কমানো হয়েছে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা। এর আগে ৯ অক্টোবর দাম ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। ফলে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চার দফায় ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম মোট ১০ হাজার ৪৩৯ টাকা কমেছে।

দামের এই ওঠানামার মধ্যে স্বর্ণ কেনার সময় ক্রেতার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের অর্থের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা। গয়নার ক্যারেট যাচাই, হলমার্ক ও পরীক্ষার সনদ দেখা, ক্যাশমেমো সংগ্রহ এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা— এই কয়েকটি সতর্কতা প্রতারণার ঝুঁকি কমাতে পারে।

মনে রাখতে হবে, দেখতে চকচকে হলেই স্বর্ণ খাঁটি হয় না। গয়নার গায়ে লেখা মানের সঙ্গে প্রকৃত বিশুদ্ধতার মিল আছে কিনা, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বর্ণ কেনার আগে প্রশ্ন করুন, যাচাই করুন এবং প্রমাণ রাখুন।