গ্যাস আসবে যখন, রান্না হবে তখন

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাসের সংকট যেন নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সকাল ও দুপুরে— যখন রান্নার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই বেশিরভাগ এলাকায় গ্যাস থাকে না, বা থাকলেও চাপ থাকে একেবারেই কম, যা দিয়ে রান্না চলে না।। ফলে অনেক পরিবারকে গভীর রাতে কিংবা ভোরে উঠে রান্না করতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছেন খাবার কিনে খেতে। নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও স্বাভাবিক সেবা না পাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা।

রাজধানীর মিরপুর ১, ২, ১১, ১৩ নম্বর, পাইকপাড়া, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মনিপুর, মালিবাগ, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে দুপুর কিংবা সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্যাসের তীব্র সংকটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও সকাল ৬-৭টার মধ্যেই গ্যাস চলে যাচ্ছে, আবার কোথাও সারাদিন পার হয়ে গভীর রাতে আসছে। ফলে রান্নার সময়সূচি বদলে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন বাসিন্দারা। অনেকেই ভোরে উঠে কিংবা গভীর রাতে রান্না সেরে রাখছেন, আর কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনছেন।

বন্ধের দিনেও মিলছে না স্বস্তি

মিরপুর ২ নম্বর এলাকার বাসিন্দা সোহানা জাহান। গ্যাসের সংকটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ছন্দে ব্যাঘাত ঘটেছে তারও। প্রতিদিনই যেন ভোগান্তি বেড়েই চলছে। সঠিক সময়ে রান্না করতে পারছেন না। এর ফলে খাওয়ার সময়ও হয়ে গেছে ওলট-পালট। তিনি বলেন, ‘‘আজকে বন্ধের দিন, তবুও সকাল থেকেই গ্যাস নেই। সকালের নাশতায় রুটি বানিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, ভেবেছিলাম বন্ধের দিন হয়তো গ্যাস আসবে তখন ভেজে নেবো। কিন্তু যে গ্যাস এসেছে তাতে একটা রুটি ভাজতে পেরেছি। বন্ধের দিনেই এই অবস্থা, অন্য সময় তো গ্যাসই পাই না।’’

রাত জেগে রান্না, সকালে খাওয়ার ব্যবস্থা

মিরপুর ২ নম্বরের বাসিন্দা আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘‘আমার দুই ছেলে নিয়ে আমাদের তিনজনের সংসার। ওরা দুইজনই চাকরি করে। সকালেই ওদের বের হয়ে যেতে হয়।  গ্যাস না থাকায় সকালে ওদের জন্য বা আমার নিজের জন্যও নাশতা তৈরি করতে পারছি না। প্রতিদিন আমাকে আগের রাতে কিছু না কিছু রান্না করে রাখতে হয়। সেটাও যে খুব আগে রান্না করতে পারি, তা না। গ্যাস আসে রাত ১২টার পরে, আবার কখনও আরও পরে আসে। তখন আমাদের সবার জন্য সকালের খাবার রান্না করে রাখি।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘গ্যাসের এই সমস্যার কারণে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এভাবে কাজ করতে খুবই বিরক্ত লাগে। বয়স হয়েছে, এসব আর পারছি না। প্রতি মাসের বিল তো ঠিকই দেই, কিন্তু গ্যাস তো পাই না।’’

কবে থেকে এই সমস্যা জানতে চাইলে আফরোজা বলেন, ‘‘আমাদের এলাকায় এটা দীর্ঘদিনের সমস্যা। বছরখানেক তো হবেই। আগে গ্যাসের সমস্যা শীতের সময় বেশি থাকতো, গরমের সময় কম থাকতো। কিন্তু এখন আর শীত-গরম নাই, সব সময়ই একই অবস্থা—গ্যাস নাই।’’

চাকরিজীবীদের বাড়তি দুর্ভোগ

মিরপুর ১ নম্বরের পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আশরিফা আলম রিফা জানান, কর্মদিবস কিংবা ছুটির দিন—প্রতিদিনই গ্যাসের সংকট ভোগাচ্ছে তাদের। এটা কেবল তাদের বাসার একার সমস্যা না, পুরো এলাকা জুড়েই একই অবস্থা।

রিফা বলেন, ‘‘এই এলাকায় প্রতিদিনই গ্যাসের সংকট থাকে। সকাল থেকেই গ্যাস থাকে না। দুপুর পর্যন্ত এই অবস্থাই থাকে। মূলত রান্নার সময়টা যখন, তখনই গ্যাস প্রায় থাকে না। দুপুর তিনটার দিকে শুধু টিমটিম করে গ্যাস আসে। এ কারণে অনেক বাসায় আগের রাতে বা বিকাল তিনটার পর রান্না করে রাখা হয়। আমার যেহেতু অফিসে যেতে হয়, তাই আমাকে আগের রাতেই রান্না করতে হয়। ছুটির দিনে হয় দুপুরের পরে রান্না করি, নাহলে মাঝে মাঝে খাবার অর্ডার করে খাওয়া হয়।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘শুধু আমাদের বাসাই না, আশপাশের বাসাতেও একই সমস্যা আছে। বন্ধের দিনেও পরিস্থিতির তেমন কোনও পরিবর্তন হয় না।’’

ভোরে না উঠলেই রান্না বন্ধ, সকাল সাতটার মধ্যেই গ্যাস চলে যায় খিলগাঁও সিপাহীবাগ এলাকায়। আসতে আসতে কখনও সন্ধ্যা কিংবা তার পরে। তাই ভোর থেকে উঠেই রান্নাবান্নার কাজ শুরু করতে হয় এখানকার বাসিন্দাদের। এই এলাকার এক বাসিন্দা নীলু মমতাজ বলেন, ‘‘সকাল সাতটার মধ্যেই আমাদের গ্যাস চলে যায়। সারাদিন আর থাকে না। সেটা আসতে আসতে কখনও সন্ধ্যা সাতটায়, আবার কখনো তারও পরে। আমাকে ভোর চারটা-পাঁচটার দিকে উঠে সব রেডি করে রান্না শেষ করতে হয়। কখনও ভোরে উঠতে দেরি হলেই ঝামেলায় পড়তে হয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই এই সমস্যার ভেতরে আছি।’’

একই চিত্র শেওড়াপাড়া, মনিপুর এলাকায়ও। গ্যাসের সংকটে ভোগান্তিতে রয়েছে এলাকাবাসী। মনিপুরের বাসিন্দা তানিয়া তানজিলা খান বলেন, ‘‘আমাদের এখানে আগে শীতের সময় গ্যাসের চাপ থাকতো না। এছাড়া অন্যান্য সময় গ্যাস থাকতো অল্প, তবে কষ্ট করে রান্না করা যেত। কিন্তু গত দেড়-দুই মাস থেকে সকাল সাতটার মধ্যেই গ্যাস চলে যায়। আসতে আসতে বিকাল ৫টা। তারপরেও যখন তখন চুলা নিভু নিভুই থাকে। তাই প্রতিদিনই সকাল সাতটার আগে রান্না করে ফেলতে হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের ঘুম থেকে উঠতে সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে।’’

কোথাও দুই দিনেও আসে না গ্যাস

মিরপুর ১৩ নম্বরের চিত্র আরও খারাপ। এই এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। কখনও কখনও দুই দিনেও গ্যাস আসে না। এই এলাকার বাসিন্দা দিলরুবা বলেন, ‘‘আমাদের গ্যাসের সমস্যা পুরোনো। সেই সকাল ৬/৭টার দিকে গ্যাস চলে যায়, আসে রাত ৯/১০টার দিকে। আবার কখনও কখনও দুই দিনেও আসে না। এই হচ্ছে এই এলাকার সমস্যা। রান্নাবান্না করতে হয় ভোর চারটার আগে উঠে, না হলে রাত ১১টার পরে।’’ এদিকে মালিবাগের বাসিন্দা গুলশান আরা বলেন, ‘‘বেশ কয়েক মাস ধরেই আমাদের গ্যাসের সমস্যা। সকাল আটটার দিকে গ্যাস চলে যায়, দুপুর দুইটার পরে আস্তে আস্তে কিছুটা আসে।’’

পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলএনজি আমদানি চলমান আছে। গ্যাস সংকট সমাধানে সরকার কাজ করছে। তিতাস গ্যাস কোম্পানির সূত্র বলছে, বর্তমানে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ২৭০ কোটি ঘনফটু পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ হয়। যার ১০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে রান্নার চুল্লায়। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার বাসাবাড়িতে আর প্রিপেইড মিটার স্থাপন করতে চাচ্ছে না। 

দেশে বর্তমানে উত্তোলনযোগ্য (রিকভারেবল) প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। তবে দেশে প্রতিদিন গ্যাস সরবরাহে প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

মন্ত্রী বলেন, আটটি গ্রাহক শ্রেণির অনুমোদিত গ্যাস লোডের ভিত্তিতে বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।