রাজধানীতে সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের জ্বালানি সংকট কাটছেই না। দিনভর শহরের বেশিরভাগ রিফুয়েলিং স্টেশন বন্ধ থাকা এবং খোলা থাকা গুটিকয়েক পাম্পে গ্যাসের তীব্র প্রেশার না থাকায় ভোগান্তি এখন চরমে। সামান্য ৬০ থেকে ১৬০ টাকার গ্যাস পেতে পাম্পের দীর্ঘ লাইনে চালকদের অপচয় হচ্ছে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময়। ফলে একদিকে জমা ও জ্বালানি খরচ উঠাতে না পেরে চরম অর্থসংকটে পড়ছেন চালকরা, অপরদিকে সড়কে যান চলাচল কমে যাওয়ায় গন্তব্যে পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সরেজমিনে ডেমরা, বাড্ডা, তেজগাঁও, মালিবাগ ও মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পাম্পগুলোর সামনে পরিবহন চালকদের চরম হাহাকার ও দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় এমন সংকট দেখেননি চালকরা
চুক্তিতে গাড়ি চালানো রেন্ট-এ-কার ও সিএনজি চালকদের মতে, তেলের বাড়তি খরচে গাড়ি চালিয়ে চুক্তি ও জমার টাকা তুলে সংসার চালানো সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা।
বনশ্রী থেকে চুক্তিতে গাড়ি চালানো সোহেল রানা জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে ডেমরা সিএনজি পাম্পে গ্যাস নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ান তিনি। সকাল সাড়ে ৮টা বাজলেও গ্যাস পাননি, মিলতে আরও প্রায় এক ঘণ্টা লাগবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “তেল দিয়ে গাড়ি চালালে চুক্তির টাকা আর আনুষঙ্গিক খরচ সামলে আমাদের কিছুই থাকে না। গ্যাসের এই অবস্থায় আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
মদনপুরের একটি পাম্পের অভিজ্ঞতা জানিয়ে অটোচালক সানাউল্লাহ বলেন, গত বুধবার রাত ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা পর মাত্র ১৬০ টাকার গ্যাস পান। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় ওই পাম্পেই আবারও আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পান মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “১৫ বছরের ড্রাইভিং ক্যারিয়ারে এমন অবিশ্বাস্য পরিস্থিতির মুখোমুখি কোনোদিন হইনি।”
জমা উঠবে কীভাবে?
সিএনজি অটোরিকশা চালকদের অবস্থা আরও বেশি সংকটাপন্ন। ১-২ ঘণ্টা চালিয়ে যে গ্যাস শেষ হয়ে যায়, তা পুনরায় ভরতে পাম্পে সময় নষ্ট হচ্ছে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা।
সিএনজি চালক আবুল হোসেন বলেন, “৩-৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৬০ থেকে ১০০ টাকার গ্যাস মিলছে। ওই গ্যাসে ১০০ টাকার ভাড়া মারতেই গ্যাস শেষ! এরপর আবার লাইনে দাঁড়ালে সারাদিন পাম্পেই শেষ। আমরা ভাড়া মারবো কখন আর গাড়ির জমাই বা ওঠাবো কখন?”
অপর এক চালক আনিছুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গ্যাস নিতেই যদি সব সময় চলে যায়, গাড়ি চালাবো কখন? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।”
পাম্পে পাম্পে তালা, প্রেশার কম থাকায় কমবেশি বন্ধের নোটিশ
রাজধানীর হাতে গোনা কয়েকটি পাম্পে দিনের বেলায় হালকা প্রেশারে গ্যাস দেওয়া হলেও অধিকাংশ পাম্পই পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বাড্ডা, খিলক্ষেত, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, মিরপুর, এয়ারপোর্ট, মালিবাগ, মুগদা, মানিকনগর ও মগবাজারের অধিকাংশ স্টেশনেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে দেখা গেছে।
তেজগাঁও আকিজ পাম্পের বিক্রয়কর্মী তারেক জানান, তেজগাঁও এলাকার সব পাম্পেই প্রেশার একদম কম। সকালে হালকা দেওয়া গেলেও এখন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, হয়তো বিকালের দিকে আবার শুরু হতে পারে।
মালিবাগ স্টেশনের বিক্রয়কর্মী সাব্বির বলেন, “প্রেশার খুব কম। চালকদের অতি আকুল আবেদনের কারণেই ঝুঁকি নিয়ে কম প্রেশারে দিচ্ছি, না হলে বন্ধ রাখতে হতো। রাতে প্রেশার একটু বাড়ে।”
মেরুল বাড্ডার জামান স্টেশনের বিক্রয়কর্মী রাব্বি জানান, তারা রাত ১১টা থেকে ভোর পর্যন্ত গ্যাস দিয়ে এখন প্রেশার না থাকায় পাম্প বন্ধ রেখেছেন।
সড়কে কমছে যানবাহন, বাড়ছে যাত্রী দুর্ভোগ ও ভাড়া
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়। সড়কে উবার, পাঠাও ও সিএনজি অটোরিকশার উপস্থিতি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে অফিসগামী সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় হওয়ার অজুহাতে চালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন।