গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতির মধ্যেও জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এবং সরবরাহ সংকটের কারণে সমালোচনা হলেও, দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানি বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করা ও নতুন টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে শিল্প ও বাণিজ্যে এখনও প্রভাব ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংকট সামাল দিতে এখন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।
প্রসঙ্গত, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে তুলে ধরা পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে তার সরকার। একই ভাষণে রমজানে ইফতার, তারাবিহ ও সেহরির সময়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান তিনি। ছয় মাস পর এসে অবশ্য বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে একাধিক সংকট সামনে এসেছে।
একই সময়ে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই গ্যাস সংকটের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতার কথা জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেছিলেন, চলমান গ্যাস সংকট চাইলেই রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। দেশে গ্যাসের অভাব রয়েছে এবং উৎপাদন বাড়াতে সময় প্রয়োজন। সেই সংকট মোকাবিলায় এখন সরবরাহ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তেল ও গ্যাস সরবরাহে সাময়িক চাপ
বছরের শুরুতেই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে। দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মাথায় মার্চ থেকে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেলের জন্য অপেক্ষায় সরকার বিব্রত হলেও সমাধান করতে আড়াই মাসের মতো সময় নেয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার থাকায় লোডশেডিংও বেড়ে যায়। রমজানের সময়ই গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের মুখোমুখি হয় সরকার।
তেলের সংকট সামলে উঠতে না উঠতেই আবার জুলাই মাসে শুরু হয় গ্যাসের সংকট। গত ২১ জুলাই ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগলে একটি টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আবহাওয়ার সমস্যার কারণে আরেকটি টার্মিনালও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আবাসিকে চুলা বন্ধ, সিএনজিতে লম্বা লাইন, শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও আবার ঘাটতির মুখোমুখি হয় সরকার। প্রায় তিন সপ্তাহ পর ১৫ আগস্ট এলএনজি সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলে গ্যাসের ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে।
ফলে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একই ভোগান্তির শিকার হয়েই চলেছে গ্রাহক। চুলায় আগুন নেই, সিএনজি পাম্পে গ্যাসের চাপ নেই। শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও সেখানেও পুরোপুরি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
এখন প্রতিদিন দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত আমদানি করে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হলেও প্রতিদিন ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে, প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে
চলতি বছর দেশে গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৮ হাজার মেগাওয়াট। প্রতিবছর গড় প্রবৃদ্ধি ১০ ভাগ হলে আগামী বছর আরও ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বাড়বে। সে হিসেবে আগামী গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ২০ হাজার মেগাওয়াট।
এদিকে সামাল দেওয়ার মতো কেন্দ্র আছে একটিই, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটি পূর্ণ ক্ষমতায় গেলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই কেন্দ্র থেকে আসলে কবে নাগাদ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে এই সংকট গ্রীষ্মে সামাল দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
চলতি বছরই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমাতে হয়েছে। এর সঙ্গে অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা যোগ হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে কোনও কোনও সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে লোডশেডিংকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
আমদানি বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিতের উদ্যোগ
সাময়িক সংকটের বাইরে সরকার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে কতটা এগোতে পারছে, তাও দেখা উচিত। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলেও সেটি উৎপাদনে আনতে সময় লাগে। ফলে তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণের জন্য এলএনজি আমদানি ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই।
সেই বাস্তবতায় সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির দিকেও যাচ্ছে। ১৩ আগস্ট সরকার যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১২ বছরের চুক্তিতে ১১৭টি এলএনজি কার্গো আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি আরও এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজির ওপর নির্ভরতার অর্থ হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ঝুঁকি গ্রহণ করা। দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে, আর সেই ব্যয়ের প্রভাব কোনও না কোনোভাবে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, বিদ্যুতের দাম কিংবা শিল্পের উৎপাদন খরচে গিয়ে পড়বে। এতে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দাম ও সরবরাহের ভারসাম্য বড় চ্যালেঞ্জ
দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুতের দাম দ্রুত না বাড়ানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার বিপরীতে জুন থেকে খুচরা পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে।
সরবরাহ ঘাটতি থাকায় একদিকে আমদানি বাড়াতে হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে সংকটের সময়ে শিল্প ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। ফলে দাম বাড়ানোর প্রশ্নে সরকারকেও সতর্ক হতে হচ্ছে। অর্থাৎ সরকার একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সেই জ্বালানির দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে—দুটি লক্ষ্য সব সময় একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সরকার অবশ্য সংকট মোকাবিলায় আমদানি বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি করা এবং নতুন টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এগুলোর সুফল পেতে সময় লাগবে।
সামনে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরীক্ষা
এই ছয় মাসের সংকট কি সাময়িক অস্থিরতা, নাকি সামনে আরও বড় জ্বালানি সংকটের পূর্বাভাস, তা বিবেচনা করেই সরকারকে পা ফেলতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমতউল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার এসেই একটি ভঙ্গুর পরিবেশ পেয়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাস চলে গেছে। এর মধ্যে সংকট কাটাতে কী পরিকল্পনা আসলে হাতে নেওয়া হয়েছে? পরিকল্পনাহীনতা এবং লক্ষ্যহীনতা জ্বালানি খাতে সরকারকে সামনের দিনগুলোতে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি করতে পারে। এই সরকার তো নতুন সরকার নয়। তারা আগেও দায়িত্ব পালন করেছে, সে সময়ও জ্বালানি খাতে সমস্যা ছিল। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যত দ্রুত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারবে সরকার, তত দ্রুত তারা সংকট সমাধানের দিকে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, একটা দেশের জন্য জ্বালানি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই জ্বালানি খাতে যদি সরকার ব্যর্থ হয়, সেটির জন্য জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, সেটি সামাল দেওয়াও কঠিন হয়ে যাবে সরকারের জন্য। তাই দ্রুত কাজ শুরু করা দরকার বলে তিনি অভিমত দেন।