নতুন সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হলো। এই সময়ে অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে স্বস্তির খবর মিলেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয় বেড়েছে, রফতানিতে সাময়িকভাবে গতি দেখা গেছে এবং সবশেষ জুলাইয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।
অর্থনীতির এই দুই দিকই গত ১৮০ দিনের বাস্তবতা। একদিকে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরানোর সুযোগ এখনো রয়েছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি ছিল নানা চাপে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ডলার ও এলসি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ছিল বড় সমস্যা। ছয় মাস পর এসব চ্যালেঞ্জের বড় অংশ এখনো রয়েছে। তবে একই সময়ে অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তনও এসেছে, যা সামনে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে।
জুলাইয়ে অর্থনীতিতে সম্প্রসারণের ইঙ্গিত
সর্বশেষ জুলাইয়ের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিয়েছে। জুলাইয়ে সামগ্রিক পিএমআই ৫২ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে ৫৭ দশমিক ৮ পয়েন্টে উঠেছে। ৫০-এর ওপরে থাকা মানে অর্থনীতি সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন খাতের পিএমআই ১৬ দশমিক ৬ পয়েন্ট বেড়ে ৬৫ দশমিক ৪ হয়েছে। কৃষি ও সেবা খাতও সম্প্রসারণে রয়েছে।
অর্থাৎ ছয় মাসের অর্থনৈতিক চিত্রে ইতিবাচক একটি দিক স্পষ্ট। উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এখন এই গতি নতুন বিনিয়োগ, নতুন কারখানা, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধিতে কতটা রূপ নেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
উৎপাদনে গতি, শিল্পে আরও সুযোগের অপেক্ষা
জুলাইয়ের পিএমআই উৎপাদন খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। উৎপাদন খাতে নতুন ক্রয়াদেশ, রফতানি ক্রয়াদেশ, উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয়, আমদানি, কর্মসংস্থান এবং সরবরাহকারীদের পণ্য সরবরাহ, সবগুলো সূচকেই সম্প্রসারণ হয়েছে।
তবে একই সময়ে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর বাস্তবতায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এ সংকটে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। কোনো কারখানায় দিনে কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানা গ্যাস সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক কারখানায় দিনে দুই-তিন ঘণ্টার বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে পিএমআইয়ে উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তার সঙ্গে শিল্পের জ্বালানি সংকটের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। চাহিদা ও উৎপাদন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, এখন নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হলে এই গতি আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রফতানিতে জুলাইয়ের স্বস্তি
জুলাইয়ে বাংলাদেশ ৪৭২ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। গত ১২ মাসের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ মাসিক রফতানি আয়। তবে গত বছরের জুলাইয়ের ৪৭৭ কোটি ডলারের তুলনায় এবার রফতানি প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ মাসিক হিসাবে রফতানির পরিমাণ বড় হলেও প্রবৃদ্ধি এখনো শক্তিশালী হয়নি।
রফতানির ভবিষ্যৎ অর্ডারের কিছু সূচকে দুর্বলতাও দেখা যাচ্ছে। পোশাক খাতের ইউডি বা নতুন রফতানি আদেশের পরিমাণ জুলাইয়ে প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো উৎপাদন না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত পণ্য পাঠাতে অতিরিক্ত ব্যয়ে আকাশপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নন।
ফলে উদ্যোক্তাদের মুনাফা কমছে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। রফতানি বাজারে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কোনো ক্রেতা সময়মতো পণ্য না পেয়ে বিকল্প দেশ থেকে পণ্য নেওয়া শুরু করলে তাকে আবার বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
তবে জুলাইয়ের ৪৭২ কোটি ডলারের রফতানি আয় এবং গত ১২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক রফতানি আয় অর্জন খাতটির সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
আমদানি বাড়ছে, বিনিয়োগে গতি ফেরার অপেক্ষা
অর্থনীতির গতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক আমদানি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পণ্য আমদানি বেড়েছে। তবে আমদানির ধরন বিশ্লেষণ করলে বিনিয়োগে আরও গতি ফেরানোর সুযোগ দেখা যায়।
মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি প্রায় ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। শিল্পের কাঁচামালের আমদানিও প্রায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ দেশে আমদানি হচ্ছে, কিন্তু নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি।
ভোগ্যপণ্য বা জ্বালানি আমদানি বাড়লে বর্তমান চাহিদা মেটানো যায়। আর মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়লে বোঝা যায় উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতের উৎপাদন বাড়াতে বিনিয়োগ করছেন। বর্তমান চিত্রে দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতে আরও গতি প্রয়োজন।
৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি
অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেতগুলোর একটি হলো বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণ। জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৯৩ সালের পর এটি সর্বনিম্ন। গত বছরের জুলাইয়ে যেখানে বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ, এক বছরের ব্যবধানে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে।
এটি অর্থনীতির চাহিদা, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র। ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা, নতুন ব্যবসা বা বড় সম্প্রসারণে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক রয়েছেন। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের চাপের কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক। ফলে অর্থনীতিতে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ উভয় দিকেই সতর্কতা রয়েছে। এই জায়গায় গতি ফেরানো আগামী সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ, আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ
ব্যাংক খাত গত ছয় মাসে অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে রয়েছে। খেলাপি ঋণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এত বড় খেলাপি ঋণ ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করে।
তবে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনও করা হয়েছে। একীভূতকরণের পর গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন ও স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকটকে সামনে এনেছে।
ইসলামী ব্যাংক, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কিংবা ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের টাকা তোলা বা স্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে অভিযোগ থাকলে সেটি শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সমস্যা নয়; পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার প্রশ্ন তৈরি করে।
ব্যাংক সংস্কারে তাই শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা মালিকানা পরিবর্তন নয়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং ঋণ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি কমেছে, স্বস্তি ফেরানোর সুযোগ তৈরি
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি। জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। জুনে এটি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে মূল্যস্ফীতি ৮৪ ভিত্তি পয়েন্ট কমেছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুনের ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ অবশ্য পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এক বছর আগে যে পণ্যের দাম ১০০ টাকা ছিল, জুলাইয়ে সেটি কিনতে গড়ে ১০৮ টাকা ৩২ পয়সা লাগছে। অর্থাৎ দাম বৃদ্ধির গতি কমেছে, কিন্তু আগের উচ্চ দামের ওপরই নতুন দাম যুক্ত হয়েছে।
জুলাইয়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০ দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতায় এখনো বড় ধরনের স্বস্তি ফেরেনি।
তবে মূল্যস্ফীতির হার কমে আসা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতির একটি ইতিবাচক সংকেত। এখন এই প্রবণতাকে মানুষের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করাই হবে পরবর্তী লক্ষ্য।
রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে বড় স্বস্তি
গত ছয় মাসে অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ইতিবাচক দিকগুলোর একটি বৈদেশিক খাত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
১২ আগস্ট দিন শেষে মোট রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাবেও রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ হিসাবে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ছয় মাসে বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।
এটি অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি। রিজার্ভ বাড়লে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ে এবং ডলার বাজারে আস্থাও কিছুটা ফিরে আসে।
রিজার্ভের এই উন্নতি অবশ্য অভ্যন্তরীণ সব সংকট কেটে যাওয়ার অর্থ নয়। তবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিত্তি তৈরি করেছে।
বাণিজ্য ঘাটতি সামলাচ্ছে রেমিট্যান্স
বৈদেশিক খাতের আরেকটি দিকেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি আয় প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে।
রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ এই চাপ সামলাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে রফতানি, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি বাড়ানো প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন হলো, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আসা বৈদেশিক মুদ্রা নতুন শিল্প ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে। এই জায়গায় আরও অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে।
ডলার বাজারে স্বস্তি, তবে চাহিদাও বেশি
রেমিট্যান্স বাড়লেও ডলারের বাজারে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। দেশে যত ডলার আসছে, একই সঙ্গে আমদানি, জ্বালানি, সরকারি ক্রয় এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধে বড় অঙ্কের ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
ফলে রেমিট্যান্সের বাড়তি অর্থের একটি বড় অংশ আমদানি ও বৈদেশিক দায় মেটাতে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ রিজার্ভের উন্নতি হলেও বাজারে প্রতিদিনের ডলার সরবরাহে স্থায়ী উদ্বৃত্ত তৈরি হয়নি।
কর্মসংস্থানেই এখন বড় সুযোগ
অর্থনীতির গতি বিচার করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি কর্মসংস্থান। প্রবৃদ্ধি নতুন চাকরি তৈরি করলে, শিল্প সম্প্রসারণ শ্রমিকের আয় বাড়ালে এবং ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়।
গত ছয় মাসে নতুন বড় শিল্পকারখানা চালুর খবরের তুলনায় উৎপাদন বন্ধ, কারখানা সংকুচিত হওয়া কিংবা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর বেশি আলোচনায় এসেছে।
গ্যাস সংকট, অর্ডার কমে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের চাপ, উচ্চ সুদ এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
নির্মাণ খাতে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা
পিএমআইয়ের সর্বশেষ তথ্য নির্মাণ খাতের অবস্থাতেও কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দিয়েছে। জুলাইয়ে নির্মাণ খাতের পিএমআই ৪৯ দশমিক ৩। জুনের তুলনায় ৯ দশমিক ১ পয়েন্ট উন্নতি হলেও এটি এখনো ৫০-এর নিচে। অর্থাৎ নির্মাণ খাত এখনো সংকোচনের মধ্যে রয়েছে। তবে এক মাসে ৯ দশমিক ১ পয়েন্ট উন্নতি খাতটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
নির্মাণ খাতের সঙ্গে আবাসন, ইস্পাত, সিমেন্ট, পরিবহন, প্রকৌশল ও বিপুল কর্মসংস্থান জড়িত। ফলে এ খাতে পুনরুদ্ধার হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।
আস্থা ফেরানোই এখন বড় লক্ষ্য
অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর জন্য অর্থের জোগানের পাশাপাশি ব্যবসায়িক আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন উদ্যোক্তা যদি মনে করেন, কারখানায় গ্যাস পাওয়া যাবে না, বিদ্যুৎ অনিশ্চিত, কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা হতে পারে, ঋণের সুদ বেশি, ডলারের দাম অনিশ্চিত, ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন এবং বাজারে চাহিদা দুর্বল, তাহলে তিনি নতুন বিনিয়োগে সতর্ক থাকবেন।
বর্তমান বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান সেই সতর্কতারই একটি বড় প্রতিফলন। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। সরকারও উৎপাদনমুখী খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক। এখন এর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, দ্রুত আমদানি ও এলসি সুবিধা, স্থিতিশীল বিনিময় হার, সহজ করব্যবস্থা, নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির নিশ্চয়তা যুক্ত হলে বিনিয়োগে গতি ফেরার সুযোগ তৈরি হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসকে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের ভিত্তি তৈরির সময় হিসেবে দেখা যায়। এ সময়ে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করা, সুশাসন ও তদারকি জোরদার করা এবং খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগগুলো ইতিবাচক। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, রাজস্ব খাতেও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করা এবং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর মাধ্যমে এ খাতকে আরও কার্যকর করতে হবে।
ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, এই মুহূর্তে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যেতে পারে।
তিনি বলেন, তাই জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি দেখা যায়নি। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার দিকে সরকারকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তার মতে, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কার্যকর সমাধান, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এই বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচক ভালো হলেই অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, শেষ পর্যন্ত সরকারের অর্থনৈতিক কর্মসূচির সাফল্য বিচার হবে সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব কতটা পড়েছে তার ভিত্তিতে। মানুষের আয় বেড়েছে কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে কি না, নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরেছে কি না এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা কমেছে, এসব বিষয়ই হবে অর্থনীতির বাস্তব অগ্রগতির প্রধান সূচক।
ছয় মাসের হিসাব: অগ্রগতির জায়গা ও করণীয়
গত ১৮০ দিনের অর্থনীতিকে কয়েকটি সূচকে ভাগ করলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উন্নতি, রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং জুলাইয়ের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জুলাইয়ে উৎপাদন খাতেও শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের সংকেত মিলেছে।
রফতানি খাতে সাময়িকভাবে স্বস্তি থাকলেও প্রবৃদ্ধি দুর্বল। মূল্যস্ফীতি কমেছে, যদিও মানুষের প্রকৃত স্বস্তি এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। মজুরি মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য কম। বেসরকারি ঋণ ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে।
নির্মাণ খাত এখনো সংকোচনে এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট শিল্পের জন্য বড় বাধা। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট রয়েছে। কর্মসংস্থানেও প্রত্যাশিত গতি আসেনি।
এই হিসাব বলছে, অর্থনীতির ওপরের স্তরে কিছুটা স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে। এখন সেই স্থিতিশীলতাকে দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আরও শক্তিশালীভাবে ছড়িয়ে দেওয়াই মূল লক্ষ্য।
তাহলে ১৮০ দিনে অর্থনীতির গতি কতটা ফিরলো?
সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি, তবে ঘুরে দাঁড়ানোর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ দেখা দিয়েছে। বৈদেশিক খাতে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের উন্নতি বড় অর্জন। জুলাইয়ের পিএমআইও বলছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ আবার সম্প্রসারণের দিকে যাচ্ছে। উৎপাদন খাতের শক্তিশালী পুনরুদ্ধার এবং সেবা খাতের ধারাবাহিক সম্প্রসারণও আশাব্যঞ্জক।
তবে অর্থনীতির প্রকৃত গতি বোঝার জন্য শুধু রিজার্ভ বা পিএমআই দেখলে হবে না। দেখতে হবে নতুন কারখানা কতটি হচ্ছে, কত টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে, কতজনের নতুন চাকরি হচ্ছে, বেসরকারি ঋণ কতটা বাড়ছে, শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, রফতানি আদেশ বাড়ছে কি না এবং মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে কি না।
এই সূচকগুলোতে এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া, শিল্পে গ্যাস সংকট, কারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা বলছে, অর্থনীতির ভেতরের চাকা এখনো পুরো গতিতে চলছে না।
অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের উন্নতি অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় দিয়েছে। এখন সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সামনে আসল পরীক্ষা
সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির বড় অর্জন যদি হয় বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা, তাহলে পরবর্তী ধাপ হবে সেই স্থিতিশীলতাকে দেশের ভেতরের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা। সরকারের আগামী ছয় মাস তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংক খাত সংস্কারে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের পরিবর্তে পেশাদার ও বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের পাশাপাশি আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের দরজা খুলতে হবে, তবে পুরোনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। কারণ একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু একজন উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন না, শ্রমিক চাকরি হারান, ব্যাংকের ঋণ অনাদায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, রফতানি কমে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে এবং সরকারের রাজস্বও কমে যায়। অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের সমাধান হলে এর ইতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়তে পারে।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্থনীতির মূল্যায়নে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের উন্নতিকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও ব্যাংকিং খাতের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনীতির চাকা থেমে নেই, বরং গতি ফেরার কিছু দৃশ্যমান সংকেত ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। জুলাইয়ের পিএমআই যদি পুনরুদ্ধারের একটি দৃশ্যমান সংকেত হয়ে থাকে, তাহলে আগামী কয়েক মাসে সেই সংকেতকে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয় বৃদ্ধিতে রূপান্তর করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্য শুধু রিজার্ভ কত বিলিয়ন ডলার বাড়ল কিংবা সূচক কত পয়েন্ট উঠল, তা দিয়ে নয়, মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো এবং কতজনের নতুন কর্মসংস্থান হলো, সেটি দিয়েই বিচার হবে।
অর্থনীতির এই দুই দিকই গত ১৮০ দিনের বাস্তবতা। একদিকে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরানোর সুযোগ এখনো রয়েছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি ছিল নানা চাপে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ডলার ও এলসি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ছিল বড় সমস্যা। ছয় মাস পর এসব চ্যালেঞ্জের বড় অংশ এখনো রয়েছে। তবে একই সময়ে অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তনও এসেছে, যা সামনে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে।
জুলাইয়ে অর্থনীতিতে সম্প্রসারণের ইঙ্গিত
সর্বশেষ জুলাইয়ের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিয়েছে। জুলাইয়ে সামগ্রিক পিএমআই ৫২ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে ৫৭ দশমিক ৮ পয়েন্টে উঠেছে। ৫০-এর ওপরে থাকা মানে অর্থনীতি সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন খাতের পিএমআই ১৬ দশমিক ৬ পয়েন্ট বেড়ে ৬৫ দশমিক ৪ হয়েছে। কৃষি ও সেবা খাতও সম্প্রসারণে রয়েছে।
অর্থাৎ ছয় মাসের অর্থনৈতিক চিত্রে ইতিবাচক একটি দিক স্পষ্ট। উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এখন এই গতি নতুন বিনিয়োগ, নতুন কারখানা, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধিতে কতটা রূপ নেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
উৎপাদনে গতি, শিল্পে আরও সুযোগের অপেক্ষা
জুলাইয়ের পিএমআই উৎপাদন খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। উৎপাদন খাতে নতুন ক্রয়াদেশ, রফতানি ক্রয়াদেশ, উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয়, আমদানি, কর্মসংস্থান এবং সরবরাহকারীদের পণ্য সরবরাহ, সবগুলো সূচকেই সম্প্রসারণ হয়েছে।
তবে একই সময়ে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর বাস্তবতায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এ সংকটে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। কোনো কারখানায় দিনে কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানা গ্যাস সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক কারখানায় দিনে দুই-তিন ঘণ্টার বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে পিএমআইয়ে উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তার সঙ্গে শিল্পের জ্বালানি সংকটের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। চাহিদা ও উৎপাদন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, এখন নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হলে এই গতি আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রফতানিতে জুলাইয়ের স্বস্তি
জুলাইয়ে বাংলাদেশ ৪৭২ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। গত ১২ মাসের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ মাসিক রফতানি আয়। তবে গত বছরের জুলাইয়ের ৪৭৭ কোটি ডলারের তুলনায় এবার রফতানি প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ মাসিক হিসাবে রফতানির পরিমাণ বড় হলেও প্রবৃদ্ধি এখনো শক্তিশালী হয়নি।
রফতানির ভবিষ্যৎ অর্ডারের কিছু সূচকে দুর্বলতাও দেখা যাচ্ছে। পোশাক খাতের ইউডি বা নতুন রফতানি আদেশের পরিমাণ জুলাইয়ে প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো উৎপাদন না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত পণ্য পাঠাতে অতিরিক্ত ব্যয়ে আকাশপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নন।
ফলে উদ্যোক্তাদের মুনাফা কমছে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। রফতানি বাজারে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কোনো ক্রেতা সময়মতো পণ্য না পেয়ে বিকল্প দেশ থেকে পণ্য নেওয়া শুরু করলে তাকে আবার বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
তবে জুলাইয়ের ৪৭২ কোটি ডলারের রফতানি আয় এবং গত ১২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক রফতানি আয় অর্জন খাতটির সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
আমদানি বাড়ছে, বিনিয়োগে গতি ফেরার অপেক্ষা
অর্থনীতির গতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক আমদানি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পণ্য আমদানি বেড়েছে। তবে আমদানির ধরন বিশ্লেষণ করলে বিনিয়োগে আরও গতি ফেরানোর সুযোগ দেখা যায়।
মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি প্রায় ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। শিল্পের কাঁচামালের আমদানিও প্রায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ দেশে আমদানি হচ্ছে, কিন্তু নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি।
ভোগ্যপণ্য বা জ্বালানি আমদানি বাড়লে বর্তমান চাহিদা মেটানো যায়। আর মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়লে বোঝা যায় উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতের উৎপাদন বাড়াতে বিনিয়োগ করছেন। বর্তমান চিত্রে দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতে আরও গতি প্রয়োজন।
৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি
অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেতগুলোর একটি হলো বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণ। জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৯৩ সালের পর এটি সর্বনিম্ন। গত বছরের জুলাইয়ে যেখানে বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ, এক বছরের ব্যবধানে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে।
এটি অর্থনীতির চাহিদা, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র। ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা, নতুন ব্যবসা বা বড় সম্প্রসারণে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক রয়েছেন। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের চাপের কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক। ফলে অর্থনীতিতে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ উভয় দিকেই সতর্কতা রয়েছে। এই জায়গায় গতি ফেরানো আগামী সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ, আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ
ব্যাংক খাত গত ছয় মাসে অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে রয়েছে। খেলাপি ঋণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এত বড় খেলাপি ঋণ ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করে।
তবে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনও করা হয়েছে। একীভূতকরণের পর গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন ও স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকটকে সামনে এনেছে।
ইসলামী ব্যাংক, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কিংবা ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের টাকা তোলা বা স্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে অভিযোগ থাকলে সেটি শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সমস্যা নয়; পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার প্রশ্ন তৈরি করে।
ব্যাংক সংস্কারে তাই শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা মালিকানা পরিবর্তন নয়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং ঋণ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি কমেছে, স্বস্তি ফেরানোর সুযোগ তৈরি
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি। জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। জুনে এটি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে মূল্যস্ফীতি ৮৪ ভিত্তি পয়েন্ট কমেছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুনের ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ অবশ্য পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এক বছর আগে যে পণ্যের দাম ১০০ টাকা ছিল, জুলাইয়ে সেটি কিনতে গড়ে ১০৮ টাকা ৩২ পয়সা লাগছে। অর্থাৎ দাম বৃদ্ধির গতি কমেছে, কিন্তু আগের উচ্চ দামের ওপরই নতুন দাম যুক্ত হয়েছে।
জুলাইয়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০ দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতায় এখনো বড় ধরনের স্বস্তি ফেরেনি।
তবে মূল্যস্ফীতির হার কমে আসা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতির একটি ইতিবাচক সংকেত। এখন এই প্রবণতাকে মানুষের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করাই হবে পরবর্তী লক্ষ্য।
রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে বড় স্বস্তি
গত ছয় মাসে অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ইতিবাচক দিকগুলোর একটি বৈদেশিক খাত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
১২ আগস্ট দিন শেষে মোট রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাবেও রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ হিসাবে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ছয় মাসে বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।
এটি অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি। রিজার্ভ বাড়লে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ে এবং ডলার বাজারে আস্থাও কিছুটা ফিরে আসে।
রিজার্ভের এই উন্নতি অবশ্য অভ্যন্তরীণ সব সংকট কেটে যাওয়ার অর্থ নয়। তবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিত্তি তৈরি করেছে।
বাণিজ্য ঘাটতি সামলাচ্ছে রেমিট্যান্স
বৈদেশিক খাতের আরেকটি দিকেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি আয় প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে।
রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ এই চাপ সামলাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে রফতানি, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি বাড়ানো প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন হলো, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আসা বৈদেশিক মুদ্রা নতুন শিল্প ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে। এই জায়গায় আরও অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে।
ডলার বাজারে স্বস্তি, তবে চাহিদাও বেশি
রেমিট্যান্স বাড়লেও ডলারের বাজারে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। দেশে যত ডলার আসছে, একই সঙ্গে আমদানি, জ্বালানি, সরকারি ক্রয় এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধে বড় অঙ্কের ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
ফলে রেমিট্যান্সের বাড়তি অর্থের একটি বড় অংশ আমদানি ও বৈদেশিক দায় মেটাতে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ রিজার্ভের উন্নতি হলেও বাজারে প্রতিদিনের ডলার সরবরাহে স্থায়ী উদ্বৃত্ত তৈরি হয়নি।
কর্মসংস্থানেই এখন বড় সুযোগ
অর্থনীতির গতি বিচার করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি কর্মসংস্থান। প্রবৃদ্ধি নতুন চাকরি তৈরি করলে, শিল্প সম্প্রসারণ শ্রমিকের আয় বাড়ালে এবং ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়।
গত ছয় মাসে নতুন বড় শিল্পকারখানা চালুর খবরের তুলনায় উৎপাদন বন্ধ, কারখানা সংকুচিত হওয়া কিংবা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর বেশি আলোচনায় এসেছে।
গ্যাস সংকট, অর্ডার কমে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের চাপ, উচ্চ সুদ এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
নির্মাণ খাতে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা
পিএমআইয়ের সর্বশেষ তথ্য নির্মাণ খাতের অবস্থাতেও কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দিয়েছে। জুলাইয়ে নির্মাণ খাতের পিএমআই ৪৯ দশমিক ৩। জুনের তুলনায় ৯ দশমিক ১ পয়েন্ট উন্নতি হলেও এটি এখনো ৫০-এর নিচে। অর্থাৎ নির্মাণ খাত এখনো সংকোচনের মধ্যে রয়েছে। তবে এক মাসে ৯ দশমিক ১ পয়েন্ট উন্নতি খাতটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
নির্মাণ খাতের সঙ্গে আবাসন, ইস্পাত, সিমেন্ট, পরিবহন, প্রকৌশল ও বিপুল কর্মসংস্থান জড়িত। ফলে এ খাতে পুনরুদ্ধার হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।
আস্থা ফেরানোই এখন বড় লক্ষ্য
অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর জন্য অর্থের জোগানের পাশাপাশি ব্যবসায়িক আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন উদ্যোক্তা যদি মনে করেন, কারখানায় গ্যাস পাওয়া যাবে না, বিদ্যুৎ অনিশ্চিত, কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা হতে পারে, ঋণের সুদ বেশি, ডলারের দাম অনিশ্চিত, ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন এবং বাজারে চাহিদা দুর্বল, তাহলে তিনি নতুন বিনিয়োগে সতর্ক থাকবেন।
বর্তমান বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান সেই সতর্কতারই একটি বড় প্রতিফলন। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। সরকারও উৎপাদনমুখী খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক। এখন এর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, দ্রুত আমদানি ও এলসি সুবিধা, স্থিতিশীল বিনিময় হার, সহজ করব্যবস্থা, নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির নিশ্চয়তা যুক্ত হলে বিনিয়োগে গতি ফেরার সুযোগ তৈরি হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসকে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের ভিত্তি তৈরির সময় হিসেবে দেখা যায়। এ সময়ে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করা, সুশাসন ও তদারকি জোরদার করা এবং খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগগুলো ইতিবাচক। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, রাজস্ব খাতেও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করা এবং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর মাধ্যমে এ খাতকে আরও কার্যকর করতে হবে।
ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, এই মুহূর্তে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যেতে পারে।
তিনি বলেন, তাই জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি দেখা যায়নি। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার দিকে সরকারকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তার মতে, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কার্যকর সমাধান, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এই বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচক ভালো হলেই অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, শেষ পর্যন্ত সরকারের অর্থনৈতিক কর্মসূচির সাফল্য বিচার হবে সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব কতটা পড়েছে তার ভিত্তিতে। মানুষের আয় বেড়েছে কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে কি না, নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরেছে কি না এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা কমেছে, এসব বিষয়ই হবে অর্থনীতির বাস্তব অগ্রগতির প্রধান সূচক।
ছয় মাসের হিসাব: অগ্রগতির জায়গা ও করণীয়
গত ১৮০ দিনের অর্থনীতিকে কয়েকটি সূচকে ভাগ করলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উন্নতি, রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং জুলাইয়ের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জুলাইয়ে উৎপাদন খাতেও শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের সংকেত মিলেছে।
রফতানি খাতে সাময়িকভাবে স্বস্তি থাকলেও প্রবৃদ্ধি দুর্বল। মূল্যস্ফীতি কমেছে, যদিও মানুষের প্রকৃত স্বস্তি এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। মজুরি মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য কম। বেসরকারি ঋণ ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে।
নির্মাণ খাত এখনো সংকোচনে এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট শিল্পের জন্য বড় বাধা। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট রয়েছে। কর্মসংস্থানেও প্রত্যাশিত গতি আসেনি।
এই হিসাব বলছে, অর্থনীতির ওপরের স্তরে কিছুটা স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে। এখন সেই স্থিতিশীলতাকে দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আরও শক্তিশালীভাবে ছড়িয়ে দেওয়াই মূল লক্ষ্য।
তাহলে ১৮০ দিনে অর্থনীতির গতি কতটা ফিরলো?
সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি, তবে ঘুরে দাঁড়ানোর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ দেখা দিয়েছে। বৈদেশিক খাতে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের উন্নতি বড় অর্জন। জুলাইয়ের পিএমআইও বলছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ আবার সম্প্রসারণের দিকে যাচ্ছে। উৎপাদন খাতের শক্তিশালী পুনরুদ্ধার এবং সেবা খাতের ধারাবাহিক সম্প্রসারণও আশাব্যঞ্জক।
তবে অর্থনীতির প্রকৃত গতি বোঝার জন্য শুধু রিজার্ভ বা পিএমআই দেখলে হবে না। দেখতে হবে নতুন কারখানা কতটি হচ্ছে, কত টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে, কতজনের নতুন চাকরি হচ্ছে, বেসরকারি ঋণ কতটা বাড়ছে, শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, রফতানি আদেশ বাড়ছে কি না এবং মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে কি না।
এই সূচকগুলোতে এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া, শিল্পে গ্যাস সংকট, কারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা বলছে, অর্থনীতির ভেতরের চাকা এখনো পুরো গতিতে চলছে না।
অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের উন্নতি অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় দিয়েছে। এখন সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সামনে আসল পরীক্ষা
সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির বড় অর্জন যদি হয় বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা, তাহলে পরবর্তী ধাপ হবে সেই স্থিতিশীলতাকে দেশের ভেতরের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা। সরকারের আগামী ছয় মাস তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংক খাত সংস্কারে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের পরিবর্তে পেশাদার ও বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের পাশাপাশি আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের দরজা খুলতে হবে, তবে পুরোনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। কারণ একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু একজন উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন না, শ্রমিক চাকরি হারান, ব্যাংকের ঋণ অনাদায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, রফতানি কমে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে এবং সরকারের রাজস্বও কমে যায়। অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের সমাধান হলে এর ইতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়তে পারে।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্থনীতির মূল্যায়নে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের উন্নতিকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও ব্যাংকিং খাতের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনীতির চাকা থেমে নেই, বরং গতি ফেরার কিছু দৃশ্যমান সংকেত ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। জুলাইয়ের পিএমআই যদি পুনরুদ্ধারের একটি দৃশ্যমান সংকেত হয়ে থাকে, তাহলে আগামী কয়েক মাসে সেই সংকেতকে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয় বৃদ্ধিতে রূপান্তর করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্য শুধু রিজার্ভ কত বিলিয়ন ডলার বাড়ল কিংবা সূচক কত পয়েন্ট উঠল, তা দিয়ে নয়, মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো এবং কতজনের নতুন কর্মসংস্থান হলো, সেটি দিয়েই বিচার হবে।









