বিশ্ববাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি, দেশে কি এর প্রভাব পড়বে?

দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের অপরিশোধিত তেলের দাম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ৯০ ডলারের ওপরে উঠেছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) প্রতি ব্যারেল তেল বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯৩ ডলারে। আগস্টজুড়ে দাম ছিল ৯০ থেকে ৯৫ ডলারের মধ্যে। এর মধ্যে ডিজেলের দামও প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় আপাতত দাম কমার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। বরং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়লে দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে গত তিন মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা হলেও দেশে জুন, জুলাই ও আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বাড়লে দেশের বাজারে এর প্রভাব কতটা পড়বে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

প্রসঙ্গত, অপরিশোধিত তেলের দাম জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দামের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলেও অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দাম একই হারে ওঠানামা করে না। অপরিশোধিত তেল শোধনের পর ডিজেল, পেট্রলসহ বিভিন্ন জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারদাম আলাদাভাবে নির্ধারিত হয়। এর সঙ্গে জাহাজ ভাড়া, বিমা ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় যুক্ত হয়ে দেশে জ্বালানির প্রকৃত আমদানি মূল্য নির্ধারিত হয়। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম সব সময় একই হারে বাড়ে না।

তবে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি হিসেবে যেমন ডিজেল আনা হয়, তেমনি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এনে সেখান থেকেও ডিজেল তৈরি করা হয়। দেশে বছরে প্রায় ৪৩ থেকে ৪৬ লাখ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল শোধনের মাধ্যমে প্রায় ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ লাখ টন পাওয়া যায়। চাহিদার বড় অংশই আমদানি করে মেটাতে হয়।

গত তিন মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় উত্থান-পতন

জুনের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়তে শুরু করলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কমে যায়। গত ২৫ জুন অপরিশোধিত তেলের দাম ৭৩ ডলারে নেমে আসে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। তখন বাজারে স্বল্পমেয়াদি অতিরিক্ত সরবরাহের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবে সেই স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

জুলাইয়ে পরিস্থিতি আবার পাল্টে যায়। মাসের শুরুতে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে থাকে। ওই সময় ৭২ ডলারের আশপাশে থাকা তেলের দাম ২৩ জুলাই ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে উঠে যায়। সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাংকারে হুতিদের হামলা এবং বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেল পরিবহন নিয়ে নতুন শঙ্কা বাজারে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। বাব আল-মান্দেব হলো লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপ্রণালি।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাইয়ের শেষ দিকে কিছুটা স্বস্তি এলেও মাসটি শেষ হয় বড় উত্থান দিয়ে। ৩১ জুলাই তেলের দাম দাঁড়ায় ৯০ দশমিক ১২ ডলার। পুরো জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে দাম বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসেই তেলের দাম প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেড়ে যায়।

আগস্টে দাম আর আগের মতো নিচে নামেনি। মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলে কয়েক দফা দাম কমলেও সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে খুলবে কি না, ইরান কী অবস্থান নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয়—এসব প্রশ্নে বাজার আবার অস্থির হয়ে ওঠে। ২১ আগস্ট তেলের দাম ৯৪ দশমিক ৩৯ ডলারে ওঠে এবং ওই সপ্তাহেই দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিপুল পরিমাণ তেল এই পথ দিয়ে যায়। সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম থাকায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়েছে। সমঝোতা না হলে এবং মজুত কমতে থাকলে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।

দেশে তেলের দামের ওঠানামা

একবারে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয় ১৯ এপ্রিল। ওই দফায় ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা করা হয়। অর্থাৎ ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা এবং অকটেনে সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়। শতাংশের হিসাবেও অকটেনের দাম সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ওই সময়ে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়।

সবশেষ আগস্ট মাসের জন্য ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার। এ মাসে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগে জুন ও জুলাই মাসেও একই মূল্যহার বহাল রাখা হয়েছিল। ফলে টানা তৃতীয় মাসের মতো ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দামে কোনও পরিবর্তন আনেনি সরকার।

গত এপ্রিলে তেলের দাম বাড়ার সময় আন্তর্জাতিক বাজার দর

গত এপ্রিলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল অত্যন্ত চড়া। মাসের শুরুতে এর দাম ছিল প্রায় ১০৯ ডলার প্রতি ব্যারেল। মধ্য এপ্রিলেও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে দাম ১০০ ডলারের আশপাশে ছিল। মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অচলাবস্থা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় দাম আরও বেড়ে যায়। ২৯ এপ্রিল তেলের দাম ১১৮ দশমিক ০৩ ডলারে উঠেছিল এবং ৩০ এপ্রিল দিনের লেনদেনে একপর্যায়ে ১২৬ দশমিক ৪১ ডলার ছুঁয়ে চার বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

এর আগের দুই মাসে কেমন ছিল

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর মার্চ ২০২৬-এ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এপ্রিলের তুলনায় অনেক কম ছিল। ফেব্রুয়ারিজুড়ে তেলের দাম মূলত ৬৫ থেকে ৭২ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। তবে মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মাসের শুরুতে ৭০ ডলারের আশপাশে থাকা দাম মার্চের শেষ দিকে প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছে যায়। ফলে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়ে যায় এবং এপ্রিলের শুরুতেই তা ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এর ফলে সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়।

দেশে বড় প্রভাবের শঙ্কা কম

এখনও জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার অতিক্রম করেনি। এতে দেশে তেলের দামের বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন নাও হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বলেন, এখন তো প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। গত তিন মাস জ্বালানি বিভাগ তেলের দাম বাড়ায়নি। যদিও এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। তবে আগামী মাসে বাড়বে কিনা, তা এখনও একেবারে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু দেশের যে জ্বালানি পরিস্থিতি, এই অবস্থায় দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা কমই।

এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ঠিক হবে না সরকারের। গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ সংকটে এমনিতেই সাধারণ মানুষ নানা ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে তেলের দাম বাড়িয়ে নতুন করে নিশ্চয় সরকার নতুন ক্ষোভের জন্ম দেবে না।’