অবশেষে আলোর মুখ দেখছে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ (ইআরএল টু) প্রকল্প। বিগত সরকারের সময় ২০১২ সাল থেকে একের পর এক প্রচেষ্টা চালিয়েও চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বহুল আলোচিত এবং কাঙ্ক্ষিত এই প্রকল্প অন্ধকারেই থেকে যায় একযুগের বেশি সময়। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে বাংলাদেশ সরকার ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইএসডিবি) মধ্যে ১০০৪ দশমিক ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি সই করেছে বিএনপি সরকার।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে সচিবালয়ে ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপ্যানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ প্রকল্পের চুক্তি সই হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ৩০ লাখ টন সক্ষমতা যুক্ত হলে রাষ্ট্রীয় রিফাইনারিটির মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টনে। দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬০ লাখ টন। ফলে প্রকল্পটি চালু হলে দেশের মোট চাহিদার বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পরিশোধন করা সম্ভব হবে।
২০১২ থেকে কেটে গেছে একযুগ
ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১২ সাল থেকেই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু একের পর এক জটিলতায় প্রকল্পটি এগোয়নি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা, ব্যয় নির্ধারণ, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বারবার উদ্যোগ নিয়েও কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
একপর্যায়ে প্রকল্পের ব্যয়ও কয়েক দফা বেড়ে যায়। ফলে প্রকল্পটির প্রস্তাব সংশোধন হয়েছে একাধিকবার। বিভিন্ন সময়ে দ্রুত বাস্তবায়নের ঘোষণা এলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারেনি। ফলে দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর থাকতে হয়েছে।
বিশেষ করে পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, পেট্রোলসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সেই চাপ সরাসরি দেশের আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর পড়েছে।
সরকারি রিফাইনারির বাইরে বেসরকারি বিনিয়োগ
এবার শুধু রাষ্ট্রীয় রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানোতেই থেমে থাকছে না সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বেসরকারি খাততে সম্পৃক্ত করতে নতুন নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যেই দেশের শীর্ষ দুই শিল্প গ্রুপ তেল পরিশোধনাগার নির্মাণে বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে। এ খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সক্ষমতা বাড়লে শুধু বাংলাদেশ নয়, আশপাশের দেশেও জ্বালানি রফতানি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে তেলের খনি না থাকলেও তারা অপরিশোধিত তেল আমদানি করে এবং পরে পরিশোধন করে বিক্রি করে থাকে। ভারতে আদানি এবং রিলায়েন্সের মতো কোম্পানিগুলোর রিফাইনারি বা পরিশোধনাগার রয়েছে।
সরকারি ইআরএলের সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশে জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে দেশের প্রায় ৬০ লাখ টন বার্ষিক চাহিদার তুলনায় স্থানীয় পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছাবে।
ইউরো-৫ জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ
ইআরএল সম্প্রসারণ প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ইউরো-৫ মানের (তেলে সালফারের পরিমাণ তুলনামূলক কম) জ্বালানি উৎপাদন। এতে উন্নতমানের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এনে স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে পরিশোধিত তেল আমদানির চাপ কমবে। একইসঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকিও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,, ‘‘দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রকল্প অনুমোদনের চেয়ে বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১২ সাল থেকে যে প্রকল্প বারবার উদ্যোগ নিয়েও বাস্তবায়িত হয়নি—এবার নির্ধারিত সময়ে সেটি শেষ করতে না পারলে, নতুন সক্ষমতার সুফল পেতে আবারও অপেক্ষা করতে হবে। তাই অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর এখন মূল পরীক্ষা হবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও সক্ষমতা নিয়ে।’’
এই বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, ‘‘দেশে অপরিশোধিত তেল বেশি আনা গেলে আর্থিক সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি ভালো মানের জ্বালানি তেলও আমরা পাবো। তবে একটা বিষয়ে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে—আগের মতো যেন কাজটা বসে না যায়। দ্রুত কাজ শেষ করতে পারলে এর সুবিধা সবাই পাবে।’’