চলতি বছর ৩ দফায় বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম, লিটারে সর্বোচ্চ ৪৩ টাকা

বছরের শুরুতে দুই দফা দাম কমলেও এরপর তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বরে দফায় দফায় দাম বাড়ায় ৯ মাস শেষে জানুয়ারির তুলনায় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে বেড়েছে ৩৩ থেকে ৪৩ টাকা। জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে পণ্য ও সেবার ব্যয়ে। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচের চাপও বেড়েছে।

বছরের শুরুতে দুই দফা দাম কমলেও এরপর এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বরে তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। সবশেষ সেপ্টেম্বরে বৃদ্ধির পর জানুয়ারির তুলনায় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে বেড়েছে ৩৩ থেকে ৪৩ টাকা। অক্টোবরেও এই বাড়তি দাম বহাল রয়েছে। জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে পণ্য ও সেবার ব্যয়ে, বাড়িয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচের চাপ।

সরকার স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক মাস ওই পদ্ধতিতে নিয়মিত মূল্য সমন্বয় করা হয়নি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর আগে বছরের শুরুতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুই দফায় দাম কমানো হয়। এরপর এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বরে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে সরকার।

সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। ফলে ডিজেলের দাম দাঁড়ায় ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। অক্টোবর মাসে এসে আবার দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

এর আগে জানুয়ারিতে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২ টাকা করে কমানো হয়। ফলে ডিজেলের দাম ১০৪ টাকা থেকে কমে ১০২ টাকা, কেরোসিন ১১৬ থেকে ১১৪ টাকা, পেট্রোল ১২০ থেকে ১১৮ টাকা এবং অকটেন ১২৪ থেকে ১২২ টাকা হয়।

ফেব্রুয়ারিতে আবারও চার ধরনের তেলের দাম লিটারে ২ টাকা করে কমানো হয়। এতে ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকায় নেমে আসে। মার্চে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত ছিল।

এরপর ১৯ এপ্রিল থেকে দাম বাড়ানো হয়। ওই দফায় ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মে মাসে আবার দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়।

জুনে আবারও দাম বাড়ানো হয়। তবে ওই দফায় ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। ফলে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা হয়। জুলাই ও আগস্টে এই দাম অপরিবর্তিত ছিল।

অর্থাৎ জানুয়ারির দামের সঙ্গে অক্টোবরের সর্বশেষ দরের তুলনায় দশ মাসে ডিজেলের দাম বেড়েছে লিটারে ৩৩ টাকা, কেরোসিন ৪১ টাকা, পেট্রোল ৪২ টাকা এবং অকটেন ৪৩ টাকা। টাকার হিসাবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অকটেনের দাম।

ভোগান্তিতে ভোক্তারা

বারবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরাসরি পরিবহন খরচের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয়ও বেড়েছে বলে মনে করছেন ভোক্তারা। বিশেষ করে ডিজেলনির্ভর পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়ায় এর প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের খরচে। ফলে জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের চাপ সামলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বেড়েছে।

উত্তরার বাসিন্দা শামসুন নাহার বলেন, গত এক বছরে বাসা ভাড়া বেড়েছে, বাস ভাড়া বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। কেবল বাড়েনি তাঁদের আয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম বেড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে খরচ কমাতে অনেক কিছু কাটছাঁট করছেন তাঁরা।

মানিকনগরের এক বাসিন্দা বলেন, মাসের শুরুতে বেতন পান। মধ্যবিত্ত হিসেবে এমনিতেই সারা মাস আয়-ব্যয় মিলাতে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে কোনো জিনিসের দাম বাড়লে তার সরাসরি শিকার হন তাঁদের মতো মধ্যবিত্তরা। তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাবে বাজারে জিনিসের দাম বেড়েছে, আবার বাস ভাড়াও বেড়েছে। সরকার লোকসানের কথা বলে দাম বাড়ায়, তাঁদের কথা ভাবে না।

কেন বারবার বাড়ে দাম

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি আর ইরানের যুদ্ধ একটি বড় কারণ। তবে সবচেয়ে বড় কারণ দেশের অর্থনীতি। সরকার একদিকে ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ঘাটতি বাড়ছে। আবার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। মানুষের আয়-ব্যয় কমার ফলে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে। এ কারণে সরকার দাম বাড়িয়ে সেটি জনগণের ঘাড়ে চাপাচ্ছে।

তিনি বলেন, সব মিলিয়ে অর্থনীতি দেউলিয়া হতে বসেছে। অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।