তিন দিন বন্ধ থাকবে সামিটের টার্মিনাল: গ্যাস সংকট বাড়বে কতটা?

দেশে এমনিতেই চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম। এর মধ্যে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য আগামীকাল ৪ নভেম্বর থেকে তিন দিন সামিটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকছে। এতে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাবে। ফলে আবাসিক, শিল্প ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনাল সক্রিয় থাকার পরও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট রয়েছে। অনেক এলাকায় আবাসিক গ্রাহকরা দিনের বড় একটা সময় গ্যাস পাচ্ছেন না। কোথাও গ্যাসের চাপ এত কম যে, বাসাবাড়িতে চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে সামিটের টার্মিনাল বন্ধের কারণে সরবরাহ আরও কমে গেলে ভোগান্তি বাড়বে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে গড়ে ২ হাজার ৫৬১ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ বর্তমানে দৈনিক ঘাটতি ১ হাজার ৪৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে ৯৮২ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকি গ্যাস দেশীয় খনি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, সামিটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকলে দৈনিক সরবরাহ ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে ২ হাজার ২৪১ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসবে। চাহিদা অপরিবর্তিত থাকলে এ সময়ে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৭৫৯ মিলিয়ন ঘনফুটে।

প্রসঙ্গত, কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত সামিট এলএনজি টার্মিনালের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য আগামীকাল ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ নভেম্বর বিকাল ৪টা পর্যন্ত রিগ্যাসিফিকেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

পেট্রোবাংলা সোমবারের (২ নভেম্বর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বর্তমানে সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সময় তা কমে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসবে। অর্থাৎ দৈনিক সরবরাহ কমবে ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ সময়ে সারাদেশে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের স্বল্প চাপ বিরাজ করতে পারে। সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছে পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষ।

উল্লেখ্য, গত বছরের ডিসেম্বরেও অনুরূপ রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছিল বলেও  জানায় পেট্রোবাংলা। সময় গ্যাস তবে অনেক পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে যে, ওই তিনদিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে।  এটি ঠিক নয়, এটি গুজব বলে মঙ্গলবার পেট্রোবাংলা একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে।

আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়তে পারে

গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। অনেক এলাকায় দিনের বড় একটা সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। কোথাও সকাল থেকে গ্যাস পাওয়া যায় না, আবার কোথাও গ্যাসের চাপ এত কম থাকে যে, চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ে। চুলায় গ্যাস এলেও তা টিমটিম করে জ্বলে। ফলে রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে বৈদ্যুতিক চুলা, রাইস কুকার কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনেকে এলপিজিও ব্যবহার করেন৷  এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। গ্যাসের সরবরাহ আরও কমে গেলে এসব ভোগান্তি বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আশকোনার বাসিন্দা হাসি আক্তার বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে এলপিজি ব্যবহার শুরু করেছিলাম, এখন এলপিজির দাম বেড়েছে।  রাতে যে গ্যাস আসতো সে গ্যাস দিয়ে বড় রান্নাগুলো  সেরে ফেলতাম। দিনের বেলা এলপিজিতে শুধু খাবার গরম করেই কাজ চালাতাম।  এখন যদি রাতেও গ্যাসের ঘাটতি হয়— তাহলে আমরা যাবো কোথায়,  ভোগান্তি কি কখনো শেষ হবে না? 

মানিক নগরের বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন,  দিনের বেলা গ্যাস এত টিমটিম করে জলে যে, বাধ্য হয়ে রাইস কুকারে ভাত রান্না করা হয়, আর বিদ্যুতের চুলায় তরকারি রান্না করা হয়৷ বিকালে গ্যাস আসলে বা সন্ধ্যার দিকে আসলে— তখন রান্নার কাজটা চুলায় সারা যায়। এখন যদি সারাবেলায় গ্যাস না থাকে, তাহলে ভোগান্তি তো আমাদের বাড়বেই।  বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে রেহানা সুলতানা বলেন, দিনের বেলা কখনো গ্যাস থাকে না, সন্ধ্যার পরে গ্যাস আসলে রাতের বেলায় রান্না সেরে রাখি। দিনের বেলায় বিদ্যুতের চুলায় গরম করে সেই খাবার পরিবেশন করি।  সব সময়ই একই অবস্থা চলছে— এই অবস্থায় যদি গ্যাসের আরও  ঘাটতি হয়,  তাহলে তো আমাদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাবে। 

সিএনজি স্টেশনে এখনই চাপ কম

গ্যাসের স্বল্প চাপের প্রভাব পড়ছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক গতিতে যানবাহনে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে গ্যাস নিতে চালকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে লম্বা লাইন এখন যেন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামিট এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে গেলে সিএনজি স্টেশনগুলোর এই পরিস্থিতিও আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে তিতাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, এমনিতে আমরা চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাই৷ যা পাই তাই রেশনিং করে সব জায়গায় গ্যাস দেয়ার চেষ্টা করি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্প বিদ্যুতে দেওয়া হয়, এরপর সিএনজি, আবাসিকে দেওয়া হয়।  ঘাটতি যদি বাড়ে তাহলে আমাদের বরাদ্দ আরও কমতে পারে। সেক্ষেত্রে গ্রাধিকার বিবেচনা করে রেশনিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। তবে এখনই  যে, গ্যাসের ঘাটতি হবে, এটা বলা ঠিক হবে না। আমরা চেষ্টা করবো সবাই যাতে গ্যাস পায়।

গ্যাসের কারণে বিদ্যুৎ ঘাটতি

বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা  ২৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে পেট্রোল বাংলা সরবরাহ করছে ৯৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।  সে হিসেবে বেশ বড় একটা ঘাটতি থাকছেই।

এদিকে পিজিসিবি জানায়, আজ মঙ্গলবার দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫৬৩৩ মেগাওয়াট। সরবরাহ করা হয়েছে ১৫ হাজার ৭৯ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ৫৫৪ মেগাওয়াট। ফলে গ্যাস ঘাটতি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হবার শঙ্কা রয়েছে। যদিও সরকারের হিসেবে বিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দিয়েই গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে।