অশুভকে আমরা স্বাভাবিক এবং অনিবার্যতা ভেবে বসে আছি। অশুভকে টপকে শুভ’র কাছে যাওয়া, ন্যায়কে ফিরিয়ে আনতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার স্বক্ষমতা কোথায়, কবে নাকি হারিয়ে বসেছিলাম আমরা। নিজেরাই বুঝি ভুলে গিয়েছিলাম প্রতিবাদের কণা আমাদের রক্তে প্রবাহিত। নিজেকে নিজে ভুলে ছিলাম বলেই অশুভ শ্যাওলা গড়ে তুলছিল আমাদের সুন্দর আকাঙ্ক্ষার ক্যানভাসে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ব্রিফিংয়ে যখন নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডি ভেঙে দিলেন, ঘোষণা করলেন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বহাল থাকার কথা। তখন খেয়াল করে দেখি ক্যানভাসের শ্যাওলা শুকিয়ে ঝরে পড়ছে।
শিক্ষামন্ত্রী ব্রিফিংয়ে যে সুরে বা দীপ্ততায় কথা বলেছেন, তার পেছনে শক্তি বা জ্বালানি জুগিয়েছে সাধারণ মানুষ। ফেসবুকের মাধ্যমে শুরু হওয়া প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে গেছে জনপদজুড়ে। প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ইসলাম ধর্মকে নিয়ে যদি মন্দ কথা বলে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে গভর্নিং বডি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারতেন, স্কুল পরিচালনার আইন অনুসরণ করে। কিন্তু কান ধরে উঠবোস করানো কোনোভাবেই সভ্য সমাজে গ্রহণীয় নয়। শুধু শিক্ষকতার পেশা কেন, যেকোনও পেশার যত সামান্য কর্মচারীই হন না কেন, তাকে এ প্রকারের শাস্তি দেওয়া সভ্যতার পরিচয় বহন করে না। যদি স্কুল-কলেজ প্রসঙ্গে থাকি তাহলে আমরা অনেকেই জানি, শিক্ষকরা গভর্নিং বডি’র কাছে দাস তুল্য হয়ে থাকেন। শ্যামল কান্তি ভক্তের বেলাতে এটা প্রমাণিত হলো। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা রাজধানীর বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা এই আচরণ নিরবে সয়ে যাচ্ছেন। শ্যামল কান্তি ভক্তের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী এবং সরকারের অবস্থান সেই গভর্নিং বডিগুলোর জন্যও সতর্কতা বলে আমি মনে করি। সরকারকে পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং তাদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতে হবে। এখানে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব সুস্পষ্ট, যে কারণে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দেয়।
আরও পড়তে পারেন: চাপাতির কোপ ও বজ্রপাত
অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা শিক্ষকরাও তৈরি করেন কোনও কোনও ক্ষেত্রে। তার একটি প্রমাণ মেলে ঢাকা কমার্স কলেজের ঘটনায়। সেখানে একটি ছেলে ও মেয়েকে ঘিরে ঘটনার সূত্রপাত। ছেলেটি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে তার পছন্দের মেয়েটিকে ভালোবাসার কথা জানায়। ফেসবুক ভিডিওতে আমি সেটা দেখেছি। কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে আমার কাছে ভালোবাসার এই নিবেদনকে সুন্দর ও নির্মল মনে হয়েছে। এমন নির্মল ভালোবাসার আবেদন এমন একটি সময়ে দেখছি- যখন বাস্তবতা হলো জোরপূর্বক ভালোবাসা আদায়ের। ভালোবাসা গ্রহণ না করলে ধর্ষণ করে হত্যা বা নির্যাতন। ভালোবাসা মানে দখল নয়, মুগ্ধতার মাধ্যমে ভালোবাসা জয় করতে হয়। কমার্স কলেজের ছেলেটি তার সময়কালের প্রজন্মকে হয়তো এই কথাটি বুঝাতে চেয়েছিল। শিক্ষকরা ১১ জনকে প্রথমে বহিষ্কার করেছিল। পরে ফেসবুক ও অন্যান্য প্রতিবাদের মুখে ওই ছেলে-মেয়েটিকে বাদ দিয়ে বাকি নয়জনকে ভর্তি করা হয়। আমি মনে করি- ওরা দুইজন ভালোবাসার সুন্দর উদাহরণ হতে পারতো। এই সময়ে যখন আমরা ভেবে বসে আছি- নির্মল, সুন্দর ভালোবাসা পলাতক, তখন সেই অনিন্দ্য ভালোবাসাকে ওরা ফিরিয়ে এনে শুভ আকাঙ্ক্ষার পথ দেখাচ্ছে আমাদের। তাই ওরা কেন ক্যাম্পাসের বাইরে থাকবে। শ্যামল কান্তি স্যার ফিরে এসেছেন। ওরাও আসুক। চলুন হেঁটে যাই শুভ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে…।
লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি