বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে আইন অত্যাবশ্যক

নাদীম কাদিরযে কোনও যুদ্ধে বিজয়ী এবং পরাজিত পক্ষ রয়েছে। দুই পক্ষই চায়, ইতিহাসে ওই সময়ের রেকর্ড তাদের পক্ষে থাকুক। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশ ইতিহাস বিকৃতির শিকার হয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি মিডিয়া জরিপে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রস্তাবিত আইনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ওই আইনে বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বঙ্গবন্ধু বা বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে অবজ্ঞা বা কটূক্তির জন্য শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক জোট তাদের নেতা নিহত জেনারেল জিয়াউর রহমানের অনুকূলে ইতিহাসের ব্যাপক বিকৃতি এবং এরসঙ্গে মিথ্যা গল্প অবলম্বন করেছে। এরমধ্যে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টিও রয়েছে।
সম্প্রতি স্পেন সফরকালে আমার নিমন্ত্রণকর্তারা বললেন, স্পেন রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে। স্থির-শান্ত অবস্থা এখানে জয়ী হয়েছে। এটা হয়েছে মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপের কারণে। ইতিহাসের অন্যান্য ইস্যুগুলো নিয়ে সাবেক স্বৈরশাসক ও বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
হিস্ট্রিক্যাল মেমরি নামের এই আইনে ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে ফ্রাঙ্কোর কর্মকাণ্ডের এবং ৪০ বছরের স্বৈরশাসনের নিন্দা জানানো হয়েছে।
১৯৩৯ সালে স্পেনিশ গৃহযুদ্ধের সময়ে দেশটির ক্ষমতায় আসেন ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো। ১৯৭৫ সালে নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি স্বৈরশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণ ঘটে স্পেনের। ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই উত্তরণ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৭০ বছর পর প্রথমবারের মতো এক বিলে স্পেন চূড়ান্তভাবে তার স্বৈরাচারী অতীতকে স্বীকারের উদ্যোগ নেয়। ওই বিলে ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো’র একনায়কতন্ত্রের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি যারা তার শিকারে পরিণত হয়েছেন তাদের প্রতি সম্মান জানানো হয়। 
আমি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসের দুটি প্রধান বিকৃতির উল্লেখ করছি:
প্রথমত, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা বন্ধ করেন। এর কারণ হতে পারে হয় তিনি সরাসরি ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের সুফলভোগী ছিলেন। অথবা অনেকের অভিযোগ অনুযায়ী তিনি নিজেও ওই অভ্যুত্থানে জড়িত ছিলেন।

তারা সম্ভাব্য সব রকম উপায়ে এবং মিথ্যার ওপর ভর করে বঙ্গবন্ধুকে উৎখাত করতে চেয়েছেন। আমার বাবা যিনি একজন সেনা কর্মকর্তা; তিনি চাকরিতে থেকেই ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য লড়াইরত এ মহান নেতার প্রতি আনুগত্যের শপথের জন্যই তার এ সাক্ষাৎ।

জিয়াউর রহমান কোথাও দৃশ্যমান ছিলেন না। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আরেকটি ইস্যু। পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি আমার শহীদ বাবা কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারতেন তাহলে জিয়াউর রহমান সেটা পাঠ করতে পারতেন না। কারণ সেনাবাহিনীতে আমার বাবা তার সাত বছরের সিনিয়র ছিলেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এমপি অবসরপ্রাপ্ত মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম এ বিষয়য়ে আরও তথ্য দিতে পারবেন।

যুদ্ধের আগে থেকেই মেজর রফিক আমার বাবার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তিনি আমার বাবা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম. আবদুল কাদির সম্পর্কে অনেকে কিছুই জানেন।

ইতিহাস বিকৃতির আরও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যায় নিহতের সংখ্যার বিষয়টিও রয়েছে। যারা ইতিহাসের এই বিকৃতি সংঘটনের চেষ্টা করেছেন তারা হয় পাকিস্তানি পুতুল অথবা তারা এটা দেখেননি যে, ১৯৭১ সালে বাঙালিদের রক্ত দিয়ে লাল বাংলাদেশ অঙ্কিত হয়েছিল। 

আমি এটা দেখেছি এবং আমি কখনও এটা ভুলতে পারবো না। ইতিহাস বিকৃতকারীদের কঠোর শাস্তির এই আইন দ্রুত কার্যকর করা হোক।

লেখক: সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার

আরও খবর: রিশার ঘাতক ওবায়দুল কোথায়?