২০১২ সালে আদালত অবমাননার দায়ে পাকিস্তানের আপিল বিভাগ দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে ৩০ সেকেন্ডের প্রতীকী সাজা দিয়েছিলেন এবং একই সঙ্গে তার পদটিও শূন্য ঘোষণা করেন। অর্থাৎ কোনও আর্থিক জরিমানা বা কারাদণ্ড না দেওয়া হলেও, বিচার বিভাগের ভাবমূর্তির স্বার্থে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দেন পাকিস্তানের আদালত। এ নিয়ে গিলানি কোনও উচ্চবাচ্য করেছেন বলে শোনা যায় না।
সম্প্রতি আমাদের দুজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রথমত আদালত অবমাননা, দ্বিতীয়ত সংবিধানের শপথ ভঙ্গের রায় দেওয়া হলেও, তারা এখনও স্বপদে বহাল আছেন। নৈতিক কারণে নিজেরা পদ থেকে তারা সরবেন কি না, তারও চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এ বিষয়ে সংবিধান বা আইনে কোনও নির্দেশনা আছে কি না।
ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দু’বছর সাজা হলে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের বিধান রয়েছে। এ হিসেবে দু’বছরের কম সাজা হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের মন্ত্রিত্ব আইনত যাচ্ছে না। কিন্তু যেহেতু আদালত ওই দুই মন্ত্রী শপথ ভেঙেছেন বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন, এ হিসেবে তাদের মন্ত্রিত্ব থাকার কথা নয়। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন। প্রশ্ন হলো, যে নৈতিকতার কথা বলা হচ্ছে, তার কোনও চর্চা আদৌ আমাদের রাজনীতিতে আছে কি না? লঞ্চডুবি অথবা সড়ক দুর্ঘটনায় শত শত মানুষের প্রাণহানির পরও কখনও কোনও মন্ত্রী পদত্যাগ করেননি। অর্থাৎ নৈতিক কারণে পদত্যাগের কোনও উদাহরণ আমাদের রাজনীতিতে নেই। যদিও আদালতের রায়ের পরও দুই মন্ত্রীর পদে থাকার বৈধতা নিয়ে ৫ সেপ্টেম্বর একটি রিট করেছেন একজন আইনজীবী।
গত ৫ মার্চ রাজধানীর বিলিয়া মিলনায়তনে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত ‘৭১-এর গণহত্যাকারীদের বিচারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র : সরকার, বিচার বিভাগ ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকসহ বক্তারা প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তারা প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে মীর কাসেম আলীর মামলায় ফের আপিল বিভাগে শুনানির দাবি জানান।
৮ মার্চ দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করা হয়। তাদের ১৪ মার্চের মধ্যে রুলের জবাব দাখিল এবং ১৫ মার্চ আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মীর কাসেম আলীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল রেখে রায় ঘোষণা করা হয়। সংক্ষিপ্ত রায়ে আদালত অবমাননার দায়ে দুই মন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেন আদালত। দুই মন্ত্রীর প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। এই অর্থ অনাদায়ে সাত দিনের বিনা শ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর পাঁচ মাস পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয় ২ সেপ্টেম্বর।
আদালত আদেশে বলেন, তারা মন্ত্রী। সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত। তারা সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন। তারা প্রধান বিচারপতি ও সর্বোচ্চ আদালতকে অবমাননা করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বিচার বিভাগের মর্যাদা হানি করেছে। বিচার প্রশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ করেছেন। যদি তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে যেকোনও ব্যক্তি বিচার বিভাগ সম্পর্কে একই রকম অবমাননাকর বক্তব্য দেবেন। তাদের বক্তব্য গুরুতর আদালত অবমাননামূলক। তবে যেহেতু তারা শুরুতেই নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছেন, তাই তাদের সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে। তাদের আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হলো।
প্রশ্ন উঠেছে, আদালতের এই রায় ও পর্যবেক্ষণের পর ওই দুই মন্ত্রী আর তাদের পদে থাকতে পারেন কি না? কেননা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবার পরে বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধান সুরক্ষার শপথ নেওয়ার পর, আদালত যদি কারও বিরুদ্ধে ওই শপথ ভাঙার রায় দেন, এরপর তিনি আর ওই পদে থাকার যোগ্য থাকেন কি না, সেটি যতটা না আইনের, তারও চেয়ে বেশি নৈতিকতার বিষয়। সংবিধানে উল্লেখ থাকুক বা না থাকুক, আদালত যদি কারও বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা কিংবা সংবিধানের শপথ ভঙ্গের রায় দেন, তাহলে তার নিজের থেকেই ওই পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত। কারণ শপথ ভাঙার পরও কেউ যদি স্বপদে বহাল থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতে এই শপথের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠবে।
যদিও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক দাবি করেছেন, তিনি সচেতনভাবে শপথ ভঙ্গ করেননি। রায়ের পুরো কাগজ হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন। ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদের এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, আমি জেনেশুনে সংবিধান লঙ্ঘন করিনি বা করতে পারি না। কারণ এই সংবিধান মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের আখরে লেখা।
কিন্তু এরপরও, সর্বোচ্চ আদালত যেহেতু দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা এবং সংবিধানের শপথ ভঙ্গের রায় দিয়েছেন, সে কারণে দুই মন্ত্রী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে এ বিষয়ে প্রথম একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন; যা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকত। এতে একদিকে ব্যক্তি হিসেবে তাদের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল হতো, তেমনি দল হিসেবে আওয়ামী লীগও লাভবান হত। দলের নেতারা বলতে পারতেন, তারা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তারা সংবিধান সুমন্নত রাখায় বদ্ধপরিকর। নৈতিকতাকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে এ দুই মন্ত্রী পদত্যাগ করলে তারা আর্থিকভাবে হয়তো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু তারা যদি পদত্যাগের একটা সংস্কৃতি চালু করে দিতে পারেন, সেটি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা উদাহরণ হবে। মানুষ তাদের এই বলে মনে রাখবে যে, ক্ষমতার লোভে তারা অন্ধ ছিলেন না। ফলে আমাদের রাজনীতিতে নৈতিকতার বালাই নেই বলে যে অভিযোগ আছে, সেই দুর্নাম ঘোচাতেও এটি একটি বড় উদ্যোগ হতে পারে।
এটা ঠিক যে, নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। একজন যেটিকে নৈতিক মনে করেন, আরেকজন সেটিকে মনে নাও করতে পারেন। আবার নৈতিক কারণে ওই দু’মন্ত্রী পদত্যাগ করলে তারা পরাজিত হয়েছেন- এমন একটা ধারণা তৈরি হতে পারে, এ কারণে ভবিষ্যতে তারা জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন কি না, এ নিয়েও সংশয় তৈরি হতে পারে। হয়তো এ কারণে তারা পদত্যাগ করছেন না।
আমীন আল রশীদ: লেখক ও সাংবাদিক