ব্রাহ্মণবাড়িয়া কী বার্তা দিলো?

আমীন আল রশীদ
০২ জুন ২০২৬, ১৪:৪৫আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ১৪:০১

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পরে দেশে যে মৌলবাদী ও ধর্মীয় উগ্রবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠীর উত্থান হয়েছিল এবং যারা অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে নানারকম অপতৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ছিল, যারা বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টি করে মাজারে হামলা ও ভাঙচুর, কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলা, কথিত ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা, বাউলদের ওপর আক্রমণ এবং তাদের বাড়িঘরে ভাঙচুর করা, নারীদের খেলা বন্ধ করে দেয়া এবং পোশাকের জন্য তাদেরকে প্রকাশ্যে রাস্তায় হেনস্থা করা, গানের অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া, ছায়ানট ও উদীচীর মতো ঐতিহ্যবাদী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, দেশের শীর্ষ দুটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে আগুন এমনকি দেশে শরিয়া আইন চালুর দাবিতে নানারকম কর্মসূচি পালন করে দেশে একটি ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করেছিল—একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের এসব উল্লম্ফন বন্ধ হবে— সরকার এই ধরনের উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে মাথাচাড়া দিতে দেবে না, দেশে একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক আবহ তৈরি হবে বলে জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেখানে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র পাওয়া একটি সিনেমার প্রদর্শনী সেখানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কওমি মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থীর বাধার মুখে। অথচ ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে এই সিনেমাটি চলেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আরও একাধিক স্থানের সিনেমা হলে। যে সিনেমাটি চালানোর জন্য সরকার অনুমোদন দিলো এবং যেটি রাজধানীতে চললো, যে সিনেমার বিরুদ্ধে কোনও অশ্লীলতা বা ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ পর্যন্ত নেই—সেই সিনেমাটি একটি গোষ্ঠীর বাধার মুখে বা তাদের আপত্তি কিংবা মব সৃষ্টির হুমকির মুখে বন্ধ করে দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রশাসন কী বার্তা দিলো? তারা কি এই বার্তা দিলো যে, রাষ্ট্র অনুমোদিত একটি সিনেমার প্রদর্শনীও তারা সমাজের কোনও একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর বাধার মুখে বন্ধ করে দিতে পারে? এই গোষ্ঠীর কাছে রাষ্ট্রের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অসহায়? সরকারও এই গোষ্ঠীকে ভয় পায় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারের ওপর যে গোষ্ঠীর ভীষণ প্রভাব ছিল, বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের ওপরেও তাদের একইরকম প্রভাব রয়েছে? তারা যা বলবে বা যা চাইবে, তাই হবে? একটি স্কুলের মিলনায়তনের ভেতরে সামান্য একটি সিনেমার প্রদর্শনী নিশ্চিত করার ক্ষমতা ও এখতিয়ার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের ছিল না?

আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে ঘটনা ঘটলো, আগামীকাল একইভাবে অন্য কোনও জেলায় যদি কোনও অনুমোদিত সিনেমার প্রদর্শনী বা কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে সেখানের কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠী বাধা দেয়, যেমনটা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, তাহলে সরকার কি সেসব জায়গায়ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করবে? সেখানেও ধর্মীয় উগ্রবাদী বা মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে? যদি তাই হয়, তাহলে একটি অনির্বাচিত দুর্বল সরকারের সঙ্গে দুই- তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত নির্বাচিত সরকারের পার্থক্য কোথায়? নাকি ধর্মীয় উদ্রবাদী ও মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর চিন্তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের চিন্তার কোনো পার্থক্য নেই?

এই গোষ্ঠী ২০১৩ সালে তাদের ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। যে দাবির মধ্যে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের মতো একটি পশ্চাৎপদ, অগণতান্ত্রিক এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং, ধর্মীয় উগ্রবাদী ও মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর কাছে সরকার ছোটখাটো ঘটনায়ও নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করবে, যখন একটি জেলা বা উপজেলা শহরে সরকার অনুমোদিত একটি সিনেমার প্রদর্শনীও হতে দিতে ব্যর্থ হবে— তখন ওই গোষ্ঠী তাদের সব দাবি নিয়ে একে একে রাজপথে নামবে। সেগুলো হয় সরকারকে মেনে নিতে হবে, না হয় ওই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরকারকে অ্যাকশনে যেতে হবে। কিন্তু এ ধরনের অ্যাকশনে যাওয়ার পরণতিও সব সময় ভালো হয় না। যে কারণে রাষ্ট্রকে শুরু থেকেই সব ধরনের উগ্রবাদ, মৌলবাদ ও কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ঘোষণা করতে হয়। ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এরকম একটি বার্তা দিতে হয় যে, এই দেশটি কোনও একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর বা নির্দিষ্ট কাঠামোয় শিক্ষিত মানুষের আবাসভূমি নয়, এই দেশটি শুধুমাত্র একধরনের রুচি, সংস্কৃতি ও চিন্তার মানুষের দেশ নয়। এটি সব ধর্মের, সব শিক্ষার, সব চিন্তা ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক্ষেত্রে আরও বেশি বৈচিত্র্যময়। কেননা, এখানেই জন্মেছেন সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বিখ্যাত ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ, কবি আল মাহমুদের মতো মানুষ। আবার এই ব্রাহ্মণবাড়িয়াই ধন্য হয়েছে অগণিত সুফি-সাধক, পীর-মাশায়েখ ও ইসলামি চিন্তাবিদের জন্য। এরকম সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যসম্পন্ন জেলা বাংলাদেশে খুব কমই আছে। সুতরাং, এখানে ইসলামি জলসা, ওয়াজ-মাহফিলে যেমন হবে, তেমনি এখানে গানের অনুষ্ঠানও হবে। এখানে সিনোর প্রদর্শনী হবে। মঞ্চ নাটক হবে। কিন্তু দেখা গেলো, একটি গোষ্ঠী বলছে এখানে সিনেমার প্রদর্শনী হবে না। কারণ এটা আলেম-ওলামার শহর। এই যুক্তিতে সিলেটেও কোনো গান-নাটক বা সিনেমা চলার কথা নয়। কারণ সেটি ওলি-আউলিয়ার শহর হিসেবে খ্যাত। সুতরাং, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর, এই যুক্তিতে যদি সেখানে সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া যায়, তাহলে কাল একই দাবিতে সিলেটেও সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেওয়া হবে। সিলেটের প্রশাসন তা ঠেকাতে পারবে না। পরদিন একই ঘটনা ঘটবে চট্টগ্রামে। এরপর সেটি ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। সরকার সেই বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য জন্য প্রস্তুত কিনা, প্রশ্নটা প্রধানমন্ত্রীর কাছে থাকলো। 

দ্বিতীয় প্রশ্ন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসলে কী বার্তা দিলো? ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বন্ধের প্রতিবাদে সোমবার (পয়লা জুন) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় আয়োজিত মানববন্ধনে স্থানীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেছেন, যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চায়, তারাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে।

এই ঘটনার পরে অবশ্য রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ আনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কওমি ঐক্য পরিষদ। মানববন্ধনে রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বলে দাবি করেছে।

প্রসঙ্গত, রুমিন ফারহানা একজন স্বতন্ত্র এমপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন। অনেকের মনে এই প্রশ্নও আছে যে, তিনি যদি বিএনপির টিকিটে এমপি হতেন, তাহলে তার নির্বাচনি এলাকায় সিনেমা বন্ধের এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নামতেন কিনা? কেননা, তার দলের অন্য কেউ বা সরকারের কোনও মন্ত্রী এ বিষয়ে কিছু বলেননি বা প্রতিবাদ জানাননি। সেই প্রশ্ন বা সংশয়ের পরেও রুমিন ফারহানা যে সৎ সাহস দেখালেন, সেজন্য তাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।

তবে এই ধন্যবাদটি পেতে পারতেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ— যদি তিনি এই ঘেষণা দিতেন যে, রাষ্ট্র অনুমোদিত সিনেমা বা যেকোনও সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার কোনও দল বা গোষ্ঠীর নেই এবং কেউ এধরনের বাধা সৃষ্টি করলে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সে কথা বলেননি। বরং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেদিন সিনেমা প্রদর্শনী বন্ধ করা হলো, তার পরদিনই চট্টগ্রামের ভয়ঙ্কর জনপদ জঙ্গল সলিমপুরে গিয়ে তিনি হুঁশিয়ার করে বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না। রাষ্ট্রের ভেতরে আর কোনও রাষ্ট্র মেনে নেওয়া হবে না। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়াও যে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে, সরকার বোধ হয় সেটি খেয়াল করছে না।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কেন এত উদ্বেগ আইএমএফের 
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কেন এত উদ্বেগ আইএমএফের 
শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো গড়ে তুলতে শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান
শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো গড়ে তুলতে শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান
ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধের পথে ট্রাম্প
ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধের পথে ট্রাম্প
কাস্টমসের নথি না পাওয়ায় ৮ হাজার কোটি টাকা পাচার অনুসন্ধানে ধীরগতি
কাস্টমসের নথি না পাওয়ায় ৮ হাজার কোটি টাকা পাচার অনুসন্ধানে ধীরগতি
সর্বশেষসর্বাধিক