তার মতে, কোনও দেশের সরকারের কৃতিত্ব পরিমাপ করার সর্বোত্তম মাপকাঠি হচ্ছে বিচার বিভাগের দক্ষতা ও যোগ্যতা। মাননীয় প্রধান বিচারপতি এখানে সম্ভবত এটিই বুঝিয়েছেন যে, আইনের শাসনই হচ্ছে একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্র হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় শর্ত। আর সেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে দেশের বিচার বিভাগ। যদিও রাষ্ট্রের অন্য দুটি স্তম্ভ আইন ও নির্বাহী বিভাগ মাঝেমধ্যেই বিচার বিভাগের মুখোমুখি দাঁড়ায়। বিশেষ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা ও সিদ্ধান্তের বেলায়; যার সবশেষ উদাহরণ বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত করা সম্পর্কিত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ।
গত আগস্টে বিচারক অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা সংক্রান্ত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। এর আগে ৫ মে হাইকোর্টের এই বৃহত্তর বেঞ্চ সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। ফলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা সম্পর্কিত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ আগের অবস্থায় ফিরে আসবে কি না—অর্থাৎ বিচারকদের অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান ফিরে আসবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। কেননা বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রধান বিচারপতি তাঁর বাণীতে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য নীতির প্রতিফলন হচ্ছে সংবিধানের মূল চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিচার বিভাগ এর সীমার বাইরে গিয়ে অন্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না।’ ফলে তিনিও প্রত্যাশা করেন, রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগ বিচার বিভাগের দায়িত্ব পালনে কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। প্রত্যেক বিভাগ দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করবে।
এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার রায় প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে র্যাব সদস্যরা যে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সেটি সমগ্র জাতিকে স্তম্ভিত করেছিল। তারা ভেবেছিল যে পার পেয়ে যাবে। প্রধান বিচারপতি লিখেছেন with attitude of impunity অর্থাৎ অপরাধীরা ভেবেছিল যে তারা দায়মুক্তি পাবে বা তাদের কিছুই হবে না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপের ফলে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হয়। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ওই মামলার বিচার নিষ্পত্তি করায় দেশের আপামর জনগণের আস্থা বিচার বিভাগের প্রতি আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
আমরা স্মরণ করতে পারি এই নারায়ণগঞ্জেরই একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তর কথা—যাকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ এনে কান ধরে ওঠবোস করানো হয়েছিল এমনকি তাকে তার পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অবশেষে উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে ন্যায়বিচার পান শ্যামল কান্তি। এছাড়া বিনা বিচারে বছরের পর বছর দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের ব্যাপারেও উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। গণমাধ্যমে এ বিষয়ে বেশ কিছু খবর প্রচারের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে অনেকেই এরইমধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। যাদের মামলা ঝুলে আছে বছরের পর বছর, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
এর বাইরে জনস্বার্থে দায়ের করা প্রচুর মামলার রায় ও নির্দেশনা এসেছে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে—যেগুলো বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ছিল বা প্রশাসনিক নানা জটিলতা ছিল। ফলে দেখা যাচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সামগ্রিকভাবে দেশকে আইনের শাসনের দিকে নিয়ে যেতে আমাদের বিচারব্যবস্থা, বিশেষ করে উচ্চ আদালত খুবই সোচ্চার।
তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের বিচার বিভাগের একটা বড় চ্যালেঞ্জ মামলার জট। এর প্রধান কারণ প্রচলিত আইনের অস্বচ্ছতা। কেননা ত্রুটিপূর্ণ ও সেকেলে আইনের ফলে মামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। দেশের নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত মামলার ভারে জর্জরিত। এর আরেকটা কারণ বিচারক সংকট। যুক্তরাষ্ট্রে ১০ লাখ মানুষের জন্য ১০৭ জন, কানাডায় ৭৫ জন, ইংল্যান্ডে ৫১ জন, অস্ট্রেলিয়ায় ৪১ জন এবং ভারতে যেখানে ১৮ জন বিচারক রয়েছেন, সেখানে বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য বিচারক মাত্র ১০ জন। অর্থাৎ এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র একজন বিচারক।
বর্তমানে আপিল বিভাগে ৮ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৮৯ জন বিচারক থাকলেও হাইকোর্ট বিভাগের ৩ জন বিচারক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন করছেন। ৪ জন বিচারক গুরুতর অসুস্থ। ফলে বিভিন্ন সময়ে বেঞ্চ গঠনের সময় প্রধান বিচারপতিকে যে হিমশিম খেতে হয়, তা তিনি অকপটেই স্বীকার করেছেন। তাছাড়া চলতি বছর ৭ জন বিচারক অবসরে যাবেন। ফলে বেঞ্চ গঠনে জটিলতা আরও প্রকট হবে বলে তার আশঙ্কা। প্রধান বিচারপতির মতে, বর্তমানে যে পরিমাণ বিচারক আছেন, তাতে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন ২৭ লক্ষাধিক মামলা নিষ্পত্তি করা অসম্ভব। তাছাড়া প্রতিদিন নতুন মামলা দায়ের হচ্ছে।
এতকিছুর পরও গত দুই বছরে মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধান বিচারপতি। সেইসঙ্গে মামলা ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং দ্রুত সেবাদানের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনও বিকল্প নেই বলেও তিনি মনে করেন।
তবে সবচেয়ে বেশি জরুরি সরকারের পলিটিক্যাল উইল বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে বিচার বিভাগ চাপে রাখতে পারলেও, আখেরে জনগণের কাছে যেহেতু সরকার তথা জনপ্রতিনিধি অর্থাৎ রাজনীতিবিদদেরই দায়বদ্ধ থাকতে হয়। সে কারণে তাদের ওপরেই নির্ভর করে, তারা আসলে কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় এবং সেখানে বিচার বিভাগকে তারা কতটা স্বাধীন দেখতে চায় বা রাখতে চায়।
তাছাড়া একটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটা অন্যতম প্রধান শর্ত যে স্বাধীন ‘গণমাধ্যম সেটিও নির্ভর করে ওই রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরেই। আর গণতন্ত্র ও আইনের শাসন যেহেতু পরস্পর সম্পর্কিত এবং গণতন্ত্রের প্রধান শর্তই যেহেতু ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা’ অতএব এই ভিন্নমতগুলোর প্রতিফলন হয় স্বাধীন গণমাধ্যমে। সুতরাং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের (আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ) সঙ্গে এই চতুর্থ স্তম্ভ (গণমাধ্যম) যদি হাত ধরাধরি করে চলতে না পারে’ তখন সেই রাষ্ট্রের সামনে অপেক্ষা করে সমূহ বিপদ।
লেখক: যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।